অনলাইন জুয়ার ভয়াল থাবা: বাড়ছে আত্মহত্যা, আতঙ্কে পরিবার ও সমাজ

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:

একটি স্মার্টফোন, কয়েকটি ক্লিক, আর রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হচ্ছে মৃত্যুর ফাঁদে। প্রথমে সামান্য লাভ দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন, এরপর বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগের প্রলোভন। তারপর একসময় সব হারিয়ে ঋণের পাহাড়, সংসারে অশান্তি, বাড়ি-জমি বিক্রি, মানসিক অবসাদ এবং শেষ পরিণতি—আত্মহত্যা। ঠাকুরগাঁওয়ে নীরবে বিস্তার ঘটছে অনলাইন জুয়ার ভয়াল সাম্রাজ্য। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন অনলাইন বেটিং অ্যাপ ও ক্যাসিনো।

সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় তরুণ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সীরাও জড়িয়ে পড়ছেন এই ভয়ংকর নেশায়। গত দুই বছরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্বজনদের বুকফাটা কান্না, স্ত্রীর অসহায়ত্ব আর কবরের পাশে মায়ের আর্তনাদ যেন বলে দিচ্ছে—এটি আর শুধু ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, ভয়াবহ সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

এই মৃত্যুর মিছিলে সর্বশেষ যোগ হয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পশ্চিম বেগুনবাড়ি ভূজারীপাড়া গ্রামের ২০ বছর বয়সী তরুণ নাহিদ রানা। পরিবারের একমাত্র ছেলে নাহিদ দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন জুয়ার নেশায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। প্রথমদিকে কয়েকবার টাকা জেতায় তিনি আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। কিন্তু ভাগ্য বদলের সেই স্বপ্ন খুব অল্প সময়েই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। একের পর এক টাকা হেরে চাপে ভেঙে পড়েন তিনি। পরিবারের সদস্যদের কাছেও নিজের কষ্ট প্রকাশ করতেন না। অবশেষে হতাশা ও আর্থিক সংকটের কাছে হার মেনে দুই মাস আগে গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেন। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে যায়।

নাহিদের মৃত্যুর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ছেলের কবরের পাশে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা নাজি। চোখের জল মুছতে মুছতে ও বুক ফাটা আর্তনাদে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে অনলাইন জুয়াই মেরে ফেলেছে। টাকা হারিয়ে সে মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছিল। আমরা বুঝতেই পারিনি ও এত বড় বিপদে ছিল। সরকারের কাছে আমার একটাই অনুরোধ—এই অনলাইন জুয়া বন্ধ করে দিন। আমার ছেলের মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়।’

নাহিদের স্বজন খুশি মনি বলেন, ‘নাহিদের এক বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী খুব সুখেই সংসার করছিল। কিন্তু অনলাইন জুয়া সেই সুখের সংসার শেষ করে দিয়েছে। এখন শিশুসন্তানকে নিয়ে তার স্ত্রী বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একটা পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে।’

আরেক স্বজন মো. মুন্না হাসান বলেন, ‘শুরুতে কয়েকবার টাকা জেতার পর নাহিদ ভাবছিল আরও বেশি টাকা আয় করবে। এরপর টাকা হারতে হারতে একসময় সে কারও সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথাও বলত না। শুধু নাহিদ নয়, এলাকায় আরও অনেকেই অনলাইন জুয়ার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকের সংসারে অশান্তি চলছে, কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন।’

প্রতিবেশী মোছা. রুমি আক্তার বলেন, ‘খুব শান্ত-ভদ্র ছেলে ছিল। কিন্তু মোবাইলে অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে একেবারে বদলে যায়। আজ নাহিদ গেছে, কাল হয়তো আমাদের পরিবারের কেউ এমন ফাঁদে পড়বে। তাই সরকারকে অনুরোধ করছি, অনলাইন জুয়া বন্ধ করুন। আর যেন কোনো মা সন্তান না হারান, কোনো স্ত্রী স্বামীহারা না হন।’

নাহিদের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। প্রায় গত দুই বছরে ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়ার কারণে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সদর উপজেলার হরিহরপুর নয়াপাড়ার ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৩০) ‘বেট জিলি’ নামের একটি অনলাইন জুয়ার সাইটে বিপুল পরিমাণ অর্থ হারিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এর আগে জানুয়ারি ২০২৬-এ পৌর শহরের পূর্ব হাজীপাড়ার সাদেকুল ইসলাম (৫০) বসতবাড়ি বিক্রি করে পাওয়া সব টাকা অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়ে আত্মহত্যা করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মহিশমারী গ্রামের আকরাম আলী অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আর ২০২৪ সালের মে মাসে একই উপজেলার রাজিউর রহমান রাজু (৩৫) মাত্র ছয় মাসে ২০ লাখ টাকার বেশি হারিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এসব ঘটনার পর থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বেড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে মাদক নিয়ে পরিবারগুলো যতটা উদ্বিগ্ন ছিল, এখন তার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে অনলাইন জুয়া। কারণ এই নেশা ঘরের ভেতরেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চলছে। ফলে পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, কখন তাদের সন্তান বা স্বজন ভয়ংকর এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছেন।

অভিভাবক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখন সন্তান ঘরে বসে মোবাইল চালাচ্ছে। কিন্তু সে পড়াশোনা করছে, নাকি অনলাইন জুয়া খেলছে, সেটা বোঝা খুব কঠিন। অধিকাংশ পরিবার এখন আতঙ্কের মধ্যে আছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াহিদ হোসেন বলেন, ‘আজ অন্যের সন্তান মারা যাচ্ছে, কাল হয়তো আমার সন্তানও একই পথে যাবে। সরকার যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পুরো যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। শুধু তরুণ নয়, এখন সব বয়সের মানুষ এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।’

আরেক স্থানীয় মো. সোহাগ আলী বলেন, ‘অনলাইন জুয়া একজন মানুষকে নয়, একটি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। এই ভয়াবহ ব্যাধির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারের কঠোর অভিযান প্রয়োজন।’

সহজে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে মৃত্যুর ফাঁদে টানছে বেটিং অ্যাপ; দুই বছরে একের পর এক প্রাণহানি, আতঙ্কে অভিভাবক-স্থানীয়রা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণদের হাতেও পৌঁছে গেছে বিভিন্ন অনলাইন বেটিং অ্যাপ। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের গোপন গ্রুপের মাধ্যমে স্থানীয় এজেন্টরা খেলোয়াড় সংগ্রহ করছে। শুরুতে অল্প টাকায় খেলিয়ে কয়েকবার জিতিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা হয়। এরপর আরও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় খেলোয়াড়রা ধার-দেনা, ঋণ এমনকি জমি-সম্পত্তি বিক্রি করেও খেলতে থাকেন। একসময় সব হারিয়ে ঋণ, পারিবারিক কলহ, মানসিক অবসাদ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েন তারা।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, সারা দেশেই অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা থেকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। বিকাশ, নগদ, রকেট, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব এবং বিদেশভিত্তিক পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে এই অর্থ হাতবদল হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এজেন্টরা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে মূল নেটওয়ার্কে পাঠিয়ে দেন। বিদেশি সার্ভারে পরিচালিত হওয়ায় এসব অ্যাপের মূল হোতাদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে মাঝেমধ্যে কয়েকজন খেলোয়াড় বা স্থানীয় এজেন্ট গ্রেপ্তার হলেও মূল নিয়ন্ত্রকরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন, আর অব্যাহত রয়েছে লাখ লাখ থেকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়া আইনে দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া সাধারণ জুয়ার সাতটি মামলায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, ‘অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এটি পুরোপুরি প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পরিবারকে সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকে একযোগে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে। সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এলে এই অনলাইন জুয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’

ঠাকুরগাঁওয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে, অনলাইন জুয়া এখন আর শুধু একটি সাইবার অপরাধ নয়; এটি একটি নীরব সামাজিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে। একটি মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের আড়ালে প্রতিদিন ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। প্রশাসনের কঠোর অভিযান, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন জুয়ার অর্থের উৎস বন্ধ করা এবং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা ছাড়া এই মৃত্যুফাঁদ থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted