তেলাপোকাদের সঙ্গে বসতে চায় মোদি

ডেস্ক রিপোর্ট

ভারতের দিল্লিতে যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল চাপের মুখে মোদি সরকার নতজানু হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তেলাপোকাদের সঙ্গে যেকোনো সময়ে আলোচনায় বসতে রাজি বলে জানিয়েছে সরকার। সরকারের পক্ষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং গতকাল জানিয়েছেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সুবিধামতো যেকোনো সময়ে সরকার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে জিতেন্দ্র ছাড়াও থাকবেন আর এক মন্ত্রী জেপি নাড্ডা। নাড্ডার বাড়ি বা অফিসে আলোচনা হতে পারে বলে তেলাপোকা জনতা পার্টি ও আন্দোলনকারীদের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী বলেছেন, ধীরে ধীরে, আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটি সমাধানের দিকে অগ্রসর হবো। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সরকারের গৃহীত ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলোর এটি একটি অংশ। আমি বিনীতভাবে আপনাদের সকলকে আলোচনায় অংশ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

কিন্তু সরকারের আলোচনায় বসতে চাওয়া নিয়ে তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি) সাফ জানিয়েছে, তারা কারও বাড়ি বা অফিসে বৈঠক করতে যাবেন না। তেলাপোকা পার্টির পক্ষে সৌরভ দাস বলেছেন, গণদরবার যন্তর মন্তরেই। মন্ত্রীদের জনগণের মাঝে আসা উচিত। তারা যদি কথা বলতে চান, তবে সেই আলোচনা যন্তর মন্তরে হওয়া উচিত। দাস আরও বলেন, তেলাপোকা পার্টি আলোচনার জন্য প্রস্তুত। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থাকলে আলোচনার জন্য বিক্ষোভ স্থলের কাছাকাছি একটি নিরপেক্ষ স্থান বিবেচনা করতে তারা ইচ্ছুক।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, আলোচনায় বসার কথা বললেও সমান্তরাল ভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। তা-ও অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তবে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের প্রশ্নে এখনো অনড় রয়েছে সিজেপি।
নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য রাজি বলে ফের জানিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। তবে বৃহস্পতিবার লোকসভায় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়েছেন, কবে, কতোক্ষণ ধরে আলোচনা হবে, তা বিরোধীরাই স্থির করুক। তবে আলোচনার জন্য কোনো পূর্বশর্ত রাখা চলবে না।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বৃহস্পতিবার দেশের তরুণদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমাদের তরুণদের ভালো রাখা এবং তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছুই এর চেয়ে বড় নয়।” এর পরেই প্রশ্নফাঁস বিতর্কে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন মোদি। দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র-যুবদের ধারাবাহিক বিক্ষোভের মাঝে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের বিচারের জন্য ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এক্স পোস্টে মোদি লিখেছেন, “প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে। তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। সেই লক্ষ্যে আমরা ‘ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং আধিকারিকদের নির্দেশও দেয়া হয়েছে।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় তেলাপোকা জনতা পার্টির মুখপাত্র সৌরভ দাস এই পদক্ষেপকে জনগণকে বিভ্রান্ত করার একটি প্রচেষ্টা বলে নাকচ করে দিয়েছেন।

মোদির পোস্টের পর বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী লিখেছেন, ‘‘আপনিই আমাদের দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন। আপনি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভাবে দখল এবং ধ্বংস হতে দিয়েছেন। এর জন্য দায়ীদের রক্ষা করেছেন এবং প্রশ্রয় দিয়েছেন।’’ মোদির উদ্দেশ্যে তিন দফা দাবি তুলে ধরেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। যার মধ্যে অন্যতম শিক্ষার্থীদের প্রতি আচরণের জন্য সরকারের ক্ষমাপ্রার্থনা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ।

নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল সংসদ চত্বর। সংসদের অভ্যন্তরেও বিরোধীদের বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে সকালে সংসদের মকর দ্বারের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন বিরোধী দলের সাংসদেরা। পাল্টা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন এনডিএ’র সাংসদেরাও। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের যুবসমাজকে প্ররোচিত করছেন রাহুল গান্ধী। বিরোধী সাংসদদের জমায়েত থেকে স্লোগান দেয়া হয়েছে “জীবন বাঁচাও, নিট বন্ধ করো।” বিরোধী সাংসদদের হাতে ধরা প্ল্যাকার্ডে শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা দাবি করা হয়। বিরোধী সাংসদদের বিক্ষোভে রাহুল ছাড়াও শামিল হয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সহ বিরোধী দলের নেতারা।

দিল্লির যন্তর মন্তরে তেলাপোকা জনতা পার্টির ধারাবাহিক ধরনাতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ছাত্র-যুবদের যোগদান বেড়ে চলেছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নৃশংস হামলার পর থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ শিক্ষার্থীদের জমায়েতে অংশ নিচ্ছেন। সরকার সতর্কতা হিসেবে প্রচুর পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী নিয়োগ করেছে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে বুধবার রাতে উত্তপ্ত হয়েছিল দিল্লির যন্তর মন্তর চত্বর। বৃহস্পতিবার সকালে সেখানকার পরিস্থিতি খানিক থমথমে। তবে ভিড় ক্রমশ বাড়ছে মানুষের। বিভিন্ন রাজ্য থেকেও তরুণ-তরুণীরা দিল্লিতে আসছেন। নিরাপত্তাগত কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে দিল্লির ১৬টি মেট্রোস্টেশন।

বৃহস্পতিবার তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)’র প্রধান অভিজিৎ দীপক জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার আমাদের আন্দোলনের ৩৪তম দিন। আর সোনম ওয়াংচুকের অনশনের ২৬তম দিন। আমাদের প্রতিবাদ যেমন চলছিল, তেমনই চলবে। তবে সোনম ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়েছেন তিনি। তবে সোনম সরকারের উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘‘গত ২০শে জুলাই সংসদ অভিযানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সত্ত্বেও পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ করেছে। আমি আশা করি, তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে না। তাদের হেনস্তা করা হবে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থায় যেন আর আঘাত করা না হয়। এর পরেই সরকারকে বার্তা দিয়ে সোনম লিখেছেন, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে এই আশ্বাস মিললে আমি আমার অনশন প্রত্যাহার করে নেবো।

তেলাপোকাদের এই আন্দোলন এবার রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ‘পুলিশি বর্বরতার’ বিরুদ্ধে সিজেপি শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। শুক্রবার কলকাতায় তেলাপোকাদের পক্ষে একটি মিছিলের জন্য পুলিশের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। গত দু’দিনে যন্তর মন্তরের আন্দোলনকারীদের সমর্থনে মুম্বই ও চেন্নাইয়ের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবারও দেশের নানা শহরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সমর্থনে বিভিন্ন দল ও সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে।

এদিকে, বিজেপি’র মস্তিষ্ক বলে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে দিল্লি পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছে। যে ভাবে সোমবার দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর যুদ্ধং দেহী ভঙ্গিতে চড়াও হয়েছিল, তা ঠিক হয়নি বলে মনে করছেন আরএসএস নেতৃত্ব। সংঘের মতে, নিটের প্রশ্ন ফাঁস, সিবিএসই’র দ্বাদশ শ্রেণির উত্তরপত্র দেখা নিয়ে গোলমালের মতো ঘটনায় ভুগতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। তাদের মধ্যে ক্ষোভ থাকাটাই স্বাভাবিক। সেই ক্ষোভ দূর করতে সরকারের অনেক আগে আলোচনায় বসা উচিত ছিল। তা হলে পরিস্থিতি এভাবে হাতের বাইরে যেত না। তবে আরএসএস শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণ নিয়ে মন্তব্য করতে চায়নি।

আরএম/কান্ট্রিবিডি 

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর