ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত ও বৈষম্য দূর করতে সরকার কাজ করছে: মির্জা ফখরুল

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

বাংলাদেশের সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত, বৈষম্য দূরীকরণ এবং জীবনমান উন্নয়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই দিনে তিনি বলেছেন, শুধু আইন প্রয়োগ কিংবা শাস্তি দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়; এ জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ঠাকুরগাঁওয়ে পৃথক দুটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য এবং পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

বিকেলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাস্তবায়নাধীন ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)’ কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপকারভোগীদের মাঝে বসতঘরের বরাদ্দপত্র, সেলাই মেশিন, বাইসাইকেল ও শিক্ষাবৃত্তির চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্যতম হলো সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেছেন। বিশেষ করে তাদের জমি দখলের মতো ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

তিনি বলেন, “এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জীবনমান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান তাঁর তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।”

মন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম বিভিন্ন সংসদীয় আসনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য জাতি-গোত্রের বিভেদ দূর করে সব সম্প্রদায়কে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা।

তিনি আরও বলেন, গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বর্তমান সরকারকে অনেক কিছু নতুন করে গড়ে তুলতে হচ্ছে। এ সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, ধর্মযাজকদের ভাতা, সাবেক খেলোয়াড়দের ভাতা এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য পরিচালিত সহায়তা কর্মসূচিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।

মির্জা ফখরুল বলেন, “আমরা সকল ধরনের জাতিগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেটিই সরকারের লক্ষ্য।”

তিনি জানান, প্রথমবারের মতো একটি রাজনৈতিক দল সংরক্ষিত মহিলা আসনে একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিকে মনোনয়ন দিয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদেরও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই একটি বড় সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিজেদের অধিকার আদায়ে তাদের আরও সোচ্চার হতে হবে। বিশেষ করে কোনোভাবেই যেন তাদের জমি জোরপূর্বক দখল করা না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

এ সময় তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জেলার অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়ে বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ক্রীড়া দলে খেলছে, যা জেলার জন্য গর্বের বিষয়।

বক্তব্যের শেষে তিনি বিগত নির্বাচনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সমর্থন ও ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আপনাদের সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে চাই। আসুন, সবাই মিলে একটি বৈষম্যহীন, সমতাভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।”

অনুষ্ঠান শেষে উপকারভোগীদের মাঝে সহায়তা সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ১০ জনকে বসতঘরের বরাদ্দপত্র, ৪৯ জনকে বাইসাইকেল, ৩৩ জনকে সেলাই মেশিন এবং ৩২৬ জন শিক্ষার্থীর হাতে মোট ১৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকার শিক্ষাবৃত্তির চেক তুলে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ৪১৮ জন উপকারভোগীর মাঝে প্রায় ৬৯ লাখ ৭৪ হাজার ১ টাকা মূল্যের ঘর, বাইসাইকেল, সেলাই মেশিন ও শিক্ষাবৃত্তি বিতরণ করা হয়।

এর আগে দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মাদকের অপব্যবহার রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আয়োজিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল।

তিনি বলেন, “আমরা মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই কার্যক্রমকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা। শুধু আইন করে কিংবা শাস্তি দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়।”

 

তিনি জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে তিনি আশাবাদী। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

মির্জা ফখরুল বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা সৃষ্টি। মানুষকে বারবার জানাতে হবে, মাদক একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তরে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পারলেই তরুণ প্রজন্মকে এই অভিশাপ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সহজ হবে।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক, পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন, সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

 

জেএইচএম/কান্ট্রিবিডি

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর