রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটটি সাংবিধানিক ছিল না; বরং একটি অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর অধীনে একটি ছলচাতুরির গণভোট জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার (১৯ জুলাই) বিকেলে গণঅধিকার পরিষদ আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি ফারুক হাসান এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক নাসির উদ্দিনসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে চারটি প্রশ্নের বিপরীতে মাত্র একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার ভাষায়, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি না, সে বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে গণভোট হওয়াই যুক্তিসঙ্গত ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত বিভিন্ন কমিশনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কিছু কমিশন গঠন করা হয়েছিল সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য নয়, বরং কিছু ব্যক্তির কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে। গুমের শিকার ব্যক্তি বা তাদের পরিবারের জন্য কোথায় প্রতিকার মিলবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো কাঠামো ছিল না।
এ সময় তিনি ঘোষণা দেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় আগামী সংসদ অধিবেশনে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ আনা হবে। ওই আইনে গুমের বিভিন্ন ধরন, শাস্তি এবং বিচারিক এখতিয়ার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশনের আইনও যুগোপযোগী করা হবে। তবে মানবাধিকার আইনে দেশের ধর্মীয়, সামাজিক মূল্যবোধ ও জাতীয় সংহতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
বক্তব্যের শুরুতে মব জাস্টিসের কড়া সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “মব কোনোদিন জাস্টিস হতে পারে না। এটি একটি অপসংস্কৃতি। আইনের শাসন দুর্বল হওয়ার কারণেই এ ধরনের সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে।” তিনি বলেন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগেই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বিচার বিভাগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, উচ্চ ও নিম্ন আদালতের অনেক বিচারক এখনো রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব পালন করছেন, যার ফলে সমাজে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অতীতের বিতর্কিত নির্বাচন ও ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতনের ঘটনায় বিচার বিভাগের একটি অংশের ভূমিকারও সমালোচনা করেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা প্রায় ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অল্প কয়েকটি বাদে বাকি অধিকাংশই বর্তমান সরকার আইনে পরিণত করেছে। তবে রাষ্ট্রের স্থায়ী কাঠামোগত সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংবিধানকে একটি পরিবর্তনশীল দলিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণভোটের বিধান ফিরে এসেছে। তবে সংবিধানের প্রস্তাবনা বা মৌলিক বিষয় পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে যে গণভোটের বিধান রয়েছে, সাম্প্রতিক গণভোট তার আওতায় পড়ে না।
আন্দোলনের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন এবং আবু সাঈদসহ বহু শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্টের বিজয় অর্জিত হয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯ জুলাই সবচেয়ে বেশি মানুষ শহীদ হয়েছিলেন।
সবশেষে তিনি বলেন, যারা শুধু মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হওয়ার জন্য জুলাইয়ের চেতনাকে ব্যবহার করছেন, তাদের পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ, স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের পথ বন্ধ এবং গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান তিনি।









