বস্তিবাসী উচ্ছেদ, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যর্থতার অভিযোগে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের পদত্যাগের দাবিতে ফের বিক্ষোভে নেমেছে দেশটির ‘জেন-জি’ তরুণরা। একসময় যাদের ব্যাপক সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিলেন, এখন সেই তরুণদের আন্দোলনের মুখেই পড়েছেন র্যাপার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা এই নেতা।
নেপালি সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডুতে এক যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করার সময় রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেল আটক করে জরিমানা করে পুলিশ। এর প্রতিবাদে ২৫ বছর বয়সী চালক গনেশ নেপালি নিজের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও শুক্রবার তার মৃত্যু হয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ নতুন করে বিস্ফোরিত হয়।
রোববার (১২ জুলাই) রাজধানী কাঠমান্ডুর সিংহ দরবার (সচিবালয়) এলাকায় হাজার হাজার তরুণ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের হাতে ছিল ‘গরিবের ওপর অত্যাচার বন্ধ করুন’ এবং ‘মানবাধিকারকে সম্মান করুন’সহ বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড।
বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন জেন-জি নেপাল অভিযোগ করেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুবসমাজের জীবনমান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তাদের দাবি, বর্তমান বাজেট ও সরকারি নীতিতে তরুণদের জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটনের উচ্ছেদ অভিযানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ পরিবারের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই তাদের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র থেকেও বের করে দেওয়া হয়েছে। তারা এই পদক্ষেপকে দরিদ্রদের প্রতি চরম অবিচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিক্ষোভকারীরা আরও অভিযোগ করেন, যে প্রধানমন্ত্রীকে তারা বিপুল জনসমর্থনে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন, তিনি এখন স্বৈরাচারী কায়দায় সরকার পরিচালনা করছেন। নেপালি গণমাধ্যমের দাবি, বালেন্দ্র শাহ ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুলিশের কঠোরতা ও আগ্রাসী আচরণও বেড়েছে।
এদিকে প্রধান বিরোধী দল নেপালি কংগ্রেসও সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে। দলটির অভিযোগ, তরুণদের মধ্যে আশা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে বেআইনি গ্রেফতার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে তারা।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের জেন-জি আন্দোলনের পর তরুণদের ব্যাপক সমর্থনে বালেন্দ্র শাহ ক্ষমতায় আসেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তার সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নীতির বিরুদ্ধে সেই তরুণরাই আবার রাজপথে নেমেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তরুণদের হতাশা এবং নিজের জনপ্রিয় ‘পপ-কালচার’ ইমেজকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় এলেও কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেননি বালেন্দ্র শাহ। ফলে তার সরকারের প্রতি তরুণদের আস্থায় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে।
স্বাধীন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম ইউরেশিয়া রিভিউ-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১০০ দিনে দুর্নীতিবিরোধী কয়েকটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিলেও সেগুলোর বেশিরভাগই প্রচারণাকেন্দ্রিক ছিল। কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের প্রতি যুবসমাজের মোহভঙ্গ হয়েছে।
সূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট, এনডিটিভি।









