ভারতীয় উপমহাদেশে মাওলানা শব্দের ব্যবহার

ড. নূর-ই আলম সিদ্দিকী

ইতিহাস শুধু রাজনীতি, বিবর্তন ও সংঘাতময় জীবনের ধারাক্রম নয়। তাতে থাকে অজস্র কাহিনি, শেকড়-সন্ধানী শব্দবৈচিত্র্য ও অনিরুদ্ধ বাক্যের বিশ্লেষণ-সংশ্লেষণ। সে সূত্রের আনুক্রমিক সরণিতে একটি শব্দের আড়েও থাকে অভাবনীয় ঘটনার কাকতাল। যা মহাকালের শরীরে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় সৃষ্টি করে।

শতাব্দীর প্রবাহে আলোকস্নাত সে শব্দই একদিন সৃষ্টি করে ‘রাশি রাশি জল ঝরনার ধ্বনি।’ মুসলমান বিদ্বৎসমাজে ‘মাওলানা’ তেমনি একটি শব্দ। এটি যেন একটি সময়। একটি সংস্কৃতি। এতেই শেষ নয়, এ যেন জ্ঞানের দ্বীপায়নে গভীর চিন্তা ধারার পরিণত প্রতীক। ‘মাওলানা’ শব্দটি ব্যবহার ও বিবর্তনের পথে এক দায়বদ্ধ ও প্রজ্ঞার অনবদ্য প্রাসঙ্গিকতা অন্তর্লীন হয়ে আছে।

শব্দটি মুসলিম বিদ্বানদের নামের আগে বিশেষ অর্থ ধারণ করে যুক্ত হয়। এবং কালিক প্রহরে তা মূর্ত হয়ে ওঠে মর্যাদা ও মানবিক চেতনার অভিব্যক্তি রূপে। ভারতবর্ষে ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকে মুসলিম শিক্ষিত সমাজের পণ্ডিত ও ধর্মীয় নেতার নামের আগে এ ‘মাওলানা’ শব্দের সংযুক্তি শুরু হয়।

যুগ পরম্পরায় শব্দটির সমাজ মননের দীর্ঘযাত্রার সঙ্গী হয়ে ওঠে। ফলে ‘মাওলানা’ শব্দ এখন শুধু নামের আগে সংযুক্ত চারটি বর্ণে বৃত্তবন্দি একক কোনো ধ্বনি নয়। বরং এটি সেসময় থেকে সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার ধারক এবং প্রগতিশীল চিন্তার অপরিহার্য আনুক্রমিক আঁধারের প্রসারিত আলোক শিখা। দিনের পিঠে শব্দটির বিস্তৃতি ঘটতে থাকে এক বিশেষ ঐতিহাসিক ও সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিসরে।

‘মাওলানা’ আরবি শব্দ। মূল শব্দ ‘মাওলা’ অর্থ অভিভাবক, প্রভু ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী। পবিত্র কুরআনের সূরা আনফালের ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনি (আল্লাহ) উত্তম অভিভাবক ও উত্তম সাহায্যকারী।’ অর্থাৎ আল্লাহ সুবাহানাহুতায়ালা উত্তম অভিভাবক এবং উত্তম সাহায্যকারী।

‘মাওলা শব্দের সঙ্গে আরবি প্রত্যয় ‘না’ যুক্ত হয়ে শব্দটি ‘মাওলানা’ গঠনরূপ পেয়েছে। এখানে ‘না’ আরবি প্রত্যয়টি, বাংলা ভাষার অব্যয়ের প্রকৃতি নয়, বরং আরবি বহুবচনে তা সদর্থক অর্থে পরিব্যপ্ত। আরবি ব্যাকরণিক ব্যাখ্যায় ‘না’ প্রত্যয় অর্থ আমাদের। ফলে ‘মাওলানা’ শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় আমাদের বন্ধু, অভিভাবক এবং শাস্ত্রবিশারদ। যিনি সবার কাছে মহামান্য, আলেম কিংবা দিকনির্দেশক।

‘মাওলানা’ শব্দটি শাব্দিক অর্থে বিবেচিত নয় বরং সম্মানসূচক ও সামাজিক প্রচলিত উপাধি হিসাবে ব্যবহৃত। আল্লাহর সিফাতের প্রতিফল স্বরূপ সীমিত গুণাবলি অর্জনের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও সার্থকতার পথে অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু তা অনেক সাধনার ভেতর দিয়ে অর্জন করতে হয়। আল্লাহ সবার প্রভু এবং তিনি মহাজ্ঞানী। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ৯৬ নম্বর আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহর জ্ঞানের অসীমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ পাক এদের (যাবতীয়) কাজকর্ম (যথাযথভাবে) পর্যবেক্ষণ করেন।’ সূরা ফাতিরের ৩১ নম্বর আয়াতের শেষ ঘোষণা হয়েছে, ‘তারা যা করে আল্লাহতায়ালা সবকিছু দেখেন।’

আল্লাহ সুবানাহুতায়ালা আসমান ও জমিনের সবকিছু দেখেন এবং সবকিছু শোনেন। ঠিক তেমনি ধর্মীয়-শাস্ত্র জ্ঞান সম্পন্ন বিচক্ষণ মানুষ কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ইজতিহাদ ও ফিকহি প্রজ্ঞা দিয়ে অনেক কিছু বোঝার এবং গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করেন। বিশিষ্ট আলেমরা এ পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে বলেন, ‘পার্থিব ও আধ্যাত্মিক চেতনা ঋদ্ধ মানুষ গভীর শাস্ত্রীয় জ্ঞান তথা কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক নির্দেশের ওপর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ইলম ও তাকওয়ার আলোর অনুষঙ্গ থেকে নিজেদের নামের আগে ‘মাওলানা’ শব্দটি ব্যবহারের প্রয়াস পেয়েছেন।’

অনেক আগে আরব ও অমুসলিম সমাজে ধর্মীয় নেতা, আলেম কিংবা সুফিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শব্দটির ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। মধ্যযুগে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের বিস্তার ঘটলে আরবি ও ফার্সি ভাষা দেশীয় সমাজের ওপর প্রাধান্য পায়। এমনতর অনিবার্য সময়ে আরবি-ফার্সি ভাষার উপাধিগুলো ভারতীয় মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে।

সরকারের আদেশে রাষ্ট্রীয় কাজে ফার্সি ভাষা চালু হলে নিজেদের প্রয়োজনে মানুষ এ ভাষাকে প্রাত্যহিক সব কাজে ব্যবহার শুরু করে। সময়ের অনুকূল পরিসরে ফার্সি ভাষার প্রভাবে ‘মাওলানা’ শব্দটি ইসলামের দ্বীনি আলেম, মুফতি, মোফাসসির, মুহাদ্দিস ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের নামের আগে সম্মান সূচক উপাধি রূপে প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ পায়। ঘটনার সাধারণ বিবরণ থেকে একথা মনে করার সুযোগ নেই, ‘মাওলানা’ উপাধি খুব সহজে ব্যক্তির নামের আগে যুক্ত হয়েছে।

সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিকূল প্রতিবেশে শব্দটির সূচনা ও প্রতিষ্ঠা। দিল্লি সালতানাত সুলতান ও মুঘলদের (১৩ শতক থেকে প্রাথমিক মুঘল আমল পর্যন্ত) অধীন থাকাকালীন মুসলিম শিক্ষিতজন শায়খ, পীর, দরবেশ, মোল্লা, কাজী, শব্দগুলো নামের আগে কর্মগুণ উপাধি হিসাবে লিখতেন। ১৭ শতকে সমাজের বিদ্বান ও উঁচুস্তরের ব্যক্তিবর্গের নামের আগে শুরু হয় আলিম ও মাওলানা শব্দের প্রচলন।

এ সময় আবির্ভূত হন মাওলানা শাইখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (১৫৫১-১৬৪২)। মাওলানা শাইখ মুবারক নাগৌরি (১৫০৬-১৫৯৩)। এ শতকে ‘মাওলানা’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও রেকর্ডভুক্ত ছিল না। ১৯ শতকে আরবি-ফার্সি জানা বিখ্যাত আলেমেদীন, মাওলানা কাশেম নানওটভি (১৮১৩-১৮৮০), মাওলানা আব্দুর রশীদ আহমদ (১৮২৯-১৯০৫), মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (১৮৬৩-১৯৪৩) এবং মাওলানা মোহাম্মদ নইমুদ্দীন (১৮৮৬-১৯৪৮) ও মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধিসহ (১৮৭২-১৯৪৪) আরও অনেক বিখ্যাত আলেম এ উপাধি গ্রহণ করেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ উপাধি লেখার প্রবাহ বেগ পায় ১৮৬৬ সালে ভারতে ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ নামক ইসলামি কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হওয়ার পর এ উপমহাদেশে ১২, ১৩ শতকে চালু হওয়া ইসলামি শিক্ষার খানকা তথা মাদ্রাসার শিক্ষকরা তাদের নামের আগে ‘মাওলানা’ শব্দ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হন। ১৮ শতকে ‘মাওলানা’ শব্দটি ব্যবহারে প্রণোদনা আনে সে সময়ের ভারতের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আবহ। এ শতকের শুরু থেকে উপমহাদেশে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের মুসলমান সম্প্রদায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতি সংকটে পড়ে। পরিস্থিতি উত্তরণের জোরালো তাগিদ অনুভব করে তৎকালীন মুসলিম শিক্ষা-সচেতন ব্যক্তিবর্গ মুসলমানদের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখতে ও দেখাতে শুরু করেন। প্রত্যাশিত এ মুহূর্তে মুসলিম বিদ্বানরা ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। সমসাময়িক বিরূপ রাজনৈতিক দোলায় ‘মাওলানা’ শব্দটি মুসলিম সমাজে দিকনির্দেশক হিসাবে সম্মানীয় ব্যক্তির নামের আগে ব্যবহার অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সময়ের তরঙ্গে ঔপনিবেশিক শোষণের করাল থাবা বিস্তৃতি পেতে থাকে। নীতিগতভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে তৎপর হয়। কিন্তু পেছনে পড়ে যায় মুসলিম সমাজ। ততদিনে মুসলমানদের অবস্থান স্পষ্ট করতে ইসলামি শরিয়া জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা এগিয়ে আসতে শুরু করেন। তারা নিজেদের দেহ, মন ও সমাজের আত্মার সমন্বিত বিকাশে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। তাদের প্রচেষ্টায় মুসলমানরা শিক্ষিত হয়ে আচরণে, দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচকতা ও আত্মপ্রত্যয়ী এবং সংস্কারমুক্ত মানুষ হওয়ার প্রত্যক্ষ দীক্ষা পায়। সমাজে নেতৃত্ব দানকারী এসব ধর্ম-শাস্ত্র জ্ঞানে বিচক্ষণ পণ্ডিতদের নামের আগে ‘মাওলানা’ শব্দটি গ্রহণযোগ্যতা ঠিক তখন থেকে সামাজিক স্বীকৃতির প্রতিষ্ঠা পায়। মুসলিম সম্প্রদায়ের মর্যাদা এবং দ্বীনহীন বিবর্ণ অবস্থা উন্নতির সর্বাত্মক প্রয়াস নিয়ে এ সময় চারজন খ্যাতিমান মুসলিম পণ্ডিতকে তাদের নামের আগে ‘মাওলানা’ শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। অসাধারণ এ বিদ্বানদের প্রথমজন মাওলানা কারামত আলী (১৮০০-১৮৭৩)। তিনি বাংলা ও উত্তর ভারতে ইসলামি সংস্কার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

দ্বিতীয়জন মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতবি (১৮৩৩-১৮৮০)। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দেওবন্দ মাদ্রাসা। এরপর মাওলানা শিবলী নোমানী (১৮৫৭-১৯১৪)। যার কর্মের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম সমাজের অন্ধকার দূরীকরণের ওপর। তিনজনের পরের জন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮)। তিনি ঔপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের একজন অন্যতম চিন্তক হিসাবে ব্যাপক প্রভাব রাখেন তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজনীতির ওপর। ব্রিটিশ প্রভাবিত রাজনীতি ও সামাজিক সংকটের মধ্যে ১৮ শতকের শেষে অর্থাৎ বিশ শতকের শুরুতে মুসলমানদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনা আবারও অনেকটা ম্লান হয়ে পড়ে। এ সময় মুসলিম শরিয়তের ওপর ধর্মের নামে নানা কুসংস্কার চেপে রসে। সমাজের প্রতিটি জায়গায় বেদাতি কাজকর্ম তথা ধর্মের নামে অধর্ম কাজে সাধারণ মানুষ আবেগে উচল হয়ে পড়লে, ধর্মের পবিত্রতা রক্ষা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ইসলামের পবিত্র আলোয় মুসলমানদের স্নাত করতে এগিয়ে আসেন কয়েকজন ইসলামি জ্ঞানসম্পন্ন বিচক্ষণ মুসলিম ব্যক্তিত্ব। যাদের প্রত্যক্ষ প্রভাবে মুসলমানদের হারানো গৌরব ও ধর্মীয় চেতনা নতুন করে দিশা পাওয়ার পথ পায়।

তারা পূর্বসূরিদের মতো শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের ইসলামি দীক্ষায় সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারের উদ্যোগ নেন। এসব পণ্ডিত তাদের সাহিত্যকর্মে ‘মাওলানা’ শব্দটি উপাধি হিসাবে রেখায়িত করার নিদর্শন স্থাপন করেন। বিশ শতকের মুসলিম নবজাগরণ শুরু হলে ফরায়েজী আন্দোলন (১৮১৮-১৮৪০), ফুরফুরা শরীফ (১৮৪৫-১৯৩৯) এবং আলীগড় আন্দোলনের (১৮৭৫-১৯২০) সরাসরি সংস্পর্শে এ আলেমরা সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন। এসব মুসলিম বিদ্বান ধর্ম, সাহিত্য ও শরিয়তের ওপর এমনকি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বইপত্র লিখতে আরম্ভ করেন। এবং তারা তাদের বই-পুস্তকের ওপর নিজের নামের সঙ্গে ‘মাওলানা’ শব্দটি প্রয়োগ করেন। গভীর সন্ধানী দৃষ্টির নিরীক্ষণে গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে আসেন যে, বাংলা ভাষায় প্রথম ‘মাওলানা’ লেখক হিসাবে এসব লেখকই প্রথম কৃতিত্ব অর্জন করেন। এ তালিকায় প্রাবন্ধিক মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০)। তিনি আলেম সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মাওলানা আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮)। বাংলায় তিনি সবচেয়ে প্রাচীন ও সুস্পষ্ট নথিভুক্ত আলেম ও ইসলামি প্রাবন্ধিক। এবং মাওলানা আবুল কাশেম (১৯০১-১৯৭৩) প্রমুখ। অবশ্য এসব মুসলিম বিদ্বান মুসলিম সমাজে ‘মাওলানা’ উপাধি নিজেদের নামের আগে ব্যবহার করলেও মানুষ তাদের আলেম ব্যক্তি বলেই চিনত, বর্তমান সময়ে যেমন ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মিস্টার বা সাহেব ব্যবহার করেন। মুসলিম আলেম সমাজে ‘মাওলানা’ শব্দটিও মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে ঠিক সেভাবেই, যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান।

মুসলিম পণ্ডিত তথা মাওলানারা সমাজে খ্যাতিমান মানুষ হিসাবে নিজেদের কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখেন। ফলে তাদের কর্ম ও সাধনার ব্যাপ্তি রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য-পত্রিকা সম্পাদনা এবং ভাষার ধারা গঠনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধর্মীয় আচরণ ও নৈতিকতা বৃদ্ধি, ইসলামের ইতিহাস, নবী সাহাবাদের জীবনী এবং নীতিবিষয়ক গ্রন্থ রচনার ঢল বাংলা সাহিত্যে অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’ ও ‘ইসলামী দুনিয়া’ নামক সাময়িকী। এর প্রভাবে সব থেকে বেশি যে বিষয়ে গতি আসে তা হলো-এ ‘মাওলানা’ লেখকরা আরবি, ফারসি শব্দ প্রয়োগ করে মুসলিম সাহিত্যধারা নামক একটি নতুন পথ সৃষ্টি করেন। বিশ শতকের প্রথম থেকে উপমহাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। অগ্রজদের দেখানো পথে উত্তর প্রজন্মের স্কলার হিসাবে এ সময় স্বীয় যোগ্যতায় উদ্ভাসিত হন চারজন, এক. মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬) ২. মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ (১৯০০-৮৬) তিন. মৌলানা আবুল হাসিম (১৯০৫-১৯৭৪) এবং মাওলানা আতাউর রহমান খাঁন গোপালগঞ্জী (১৯০৫-১৯৮১)। এ শতকে আরও উল্লেখযোগ্য যে, কয়জন ইসলামি পণ্ডিত ‘মাওলানা’ উপাধি নিয়ে দ্যুতিমান, তারা হলেন, মাওলানা আবু বকর মোহাম্মদ জাকারিয়া (১৯৬০, মাওলানা নেমাত উল্লাহ (১৯৩৬) ও মাওলানা আবুল কালাম শামসী (১৯৫১) প্রমুখ।

ওপরের বিশ্লেষণ ছাড়াও কিছু তাৎপর্যপূর্ণ প্রেক্ষাপট এই ‘মাওলানা’ শব্দটি নামের আগে ব্যবহার করার পেছনের সূত্র হিসাবে কাজ করেছে। শব্দটি ব্যবহারের একেবারে শুরুতে ধর্মীয় পাণ্ডিত্য ও সম্মান প্রদর্শন করতে ‘মাওলানা’ উপাধিটি মুসলমান বিদ্বান ব্যক্তিকে দেওয়া হতো। এক্ষেত্রে যিনি মাদ্রাসা থেকে ইসলামি আইন (ফিকহ) হাদিস, তাফসির ও আরবি সাহিত্যে গভীর জ্ঞান অর্জন করতেন, তিনিই শুধু নামের আগে মাওলানা ব্যবহার করতে পারতেন। এ কারণে সমাজে এসব ব্যক্তি ধর্মশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মর্যাদা মর্যাদায় অভিষিক্ত হতেন। যদিও পবিত্র কুরআনে শব্দটি একমাত্র আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, তারপরও ধর্মীয় নেতা ও শরিয়ত বিশেজ্ঞদের রূপক হিসাবে ভারতে এর ব্যবহার খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে। গবেষকরা মনে করেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশ আমলে হিন্দু শিক্ষিত ব্যক্তিরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে শ্রী, শ্রীযুক্ত কিংবা পণ্ডিত উপাধি ব্যবহার করতেন। সে সময় মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় নেতারাও নিজেদের ধর্মীয় ও সংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্র্য বজায় রাখতে আরবি ‘মাওলানা’ উপাধিটি ব্যবহার শুরু করেন।

বর্তমানে ‘মাওলানা’ শব্দটি শুধুই সম্মানসূচক হিসাবে ব্যবহার হতে হতে বাস্তব জ্ঞান ও যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে। এ নিয়ে ঊনবিংশ শতকের শেষ ভাগে মুসলিম সমাজে বিতর্কও দেখা দেয়। বিশেষ করে আলীগড় আন্দোলনপন্থিরা আধুনিক শিক্ষিত মুসলমানদের জন্য মাওলানা নয় বরং স্যার বা মিস্টার উপাধি গ্রহণ করতে শুরু করেন। অবশ্য ১৮ শতকে মুসলিম সমাজে ‘মাওলানা’ শুধু ধর্মীয় উপাধি নয় বরং জ্ঞান, নেতৃত্ব, সামাজিক সম্মান ও রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আরবি ভাষা থেকে আগত এ শব্দ ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষত উপনিবেশিক সময়ে মুসলিম সমাজের পরিচয় ও ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক চিহ্ন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সময়ের পরির্তনে মানুষের শিক্ষা, নৈতিকতা, ধর্মীয় জ্ঞান, আচরণ ও প্রাত্যহিক জীবনে মূল্যবোধে বহনের সীমাবদ্ধতায় এ শব্দটি দিন দিন তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলতে বসেছে। কারণ শব্দটির নিবেদন এখন গভীর ব্যঞ্জনা থেকে বেরিয়ে ‘পাবলিক রিচুয়াল’ তথা সাধারণের সামনে ‘পালিত আচার সর্বস্ব’ রূপ পরিগ্রহ করেছে। ফলে একশ্রেণির বিশেষজ্ঞ আলেম ছাড়া ‘মাওলানা’ শব্দটির মর্যাদার গভীরতা যেন সবাই ভুলতে বসেছে। বর্তমানে মাদ্রাসায় আরবি শাস্ত্র শিক্ষা প্রদানের কাজে যেসব বিদ্বান সংযুক্ত আছেন এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধর্মীয় আলোচনা করেন তারাই ব্যাপকভাবে এ শব্দটিকে শিরোনামগতভাবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু তাতে ঐতিহাসিক ও দস্তাবেজিক উপাধি প্রয়োগ নেই। সঙ্গত কারণে তাই গভীর দৃষ্টি দিয়ে ‘মাওলানা’ শব্দের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব অনুধাবন আশু প্রয়োজন। অনুরাগীদের ইসলামি শাস্ত্রের গভীর চর্চা ও অনুশীলন অব্যাহত রেখে শরিয়তের অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জনের এখনই মোক্ষম সময়। তাহলে আগামীতেও ইসলামি মূল্যবোধ সম্পন্ন স্কলাররা আগের মনীষীদের মতো সমাজে ‘মাওলানা’ উপাধি নিয়ে শ্রেষ্ঠ হবেন তা নিশ্চিত।

সৌজন্যে : যুগান্তর

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর