মূল্যস্ফীতির চাপে ক্রেডিট কার্ডে বাড়ছে ভোগব্যয়

ডেস্ক রিপোর্ট

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় সামাল দিতে ক্রমেই ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছেন দেশের ভোক্তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা আগের মাস এপ্রিলের তুলনায় ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত বছরের মে মাসে এ লেনদেন ছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় বেড়েছে ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক পরিবার এখন নগদের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছে। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তিগত ঋণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, মে মাসে দেশের মোট ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের প্রায় অর্ধেকই হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এতে বোঝা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় ও খুচরা কেনাকাটায় কার্ড ব্যবহারের প্রবণতাই সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, বিভিন্ন ব্যাংকের ক্যাশব্যাক ও ডিসকাউন্ট সুবিধা, কার্ড ব্যবহারের সহজতা এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কার্ড গ্রহণের হার বেশি হওয়ায় এ প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

দেশের বাইরে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যয়ও বেড়েছে। মে মাসে বিদেশে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৪২৫ কোটি টাকা, যা এপ্রিলের ৪২৪ কোটি টাকার তুলনায় ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকের ইস্যুকৃত কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে ব্যয় কমেছে। মে মাসে এ ধরনের লেনদেন হয়েছে ৩১২ কোটি টাকা, যা এপ্রিলের ৩২৯ কোটি টাকার তুলনায় ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ কম। তবে বছরওয়ারি হিসাবে বিদেশিদের বাংলাদেশে কার্ড ব্যয় বেড়েছে ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যা পর্যটন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস শেষে দেশের ক্রেডিট কার্ডের মোট অনুমোদিত ঋণসীমা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে কার্ডধারীদের কাছে বকেয়া বা আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণ ১৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এতে স্পষ্ট, অনেক গ্রাহক তাৎক্ষণিক পারিবারিক ব্যয় মেটাতে এখনো ক্রেডিট কার্ডের ঋণের ওপর নির্ভর করছেন।

আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রই রয়েছে শীর্ষে। মে মাসে বিদেশে মোট কার্ড ব্যয়ের ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে দেশটিতে। এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য (৯.৬০ শতাংশ), থাইল্যান্ড (৮.৮৫ শতাংশ), সিঙ্গাপুর (৭.৮১ শতাংশ), সৌদি আরব (৭.৪৭ শতাংশ), ভারত (৬.৮৯ শতাংশ), মালয়েশিয়া (৫.০৮ শতাংশ), নেদারল্যান্ডস (৪.৮৯ শতাংশ), চীন (৪.৭৮ শতাংশ), কানাডা (৪.০৩ শতাংশ), অস্ট্রেলিয়া (৩.৯৩ শতাংশ) এবং আয়ারল্যান্ড (৩.৫১ শতাংশ)। উল্লেখযোগ্যভাবে এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যয়ের অংশ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতির চাপ মানুষকে সাময়িকভাবে ক্রেডিট কার্ডনির্ভর করে তুলছে। তবে আয় ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা না করে অতিরিক্ত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘায়িত হলে মানুষের ভোগব্যয় টিকিয়ে রাখতে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে বকেয়া ঋণও বাড়বে। তাই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সংযম এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

জেএইচএম/কান্ট্রিবিডি

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর