যেভাবে ধরা পড়লেন মোজাফফর!

ডেস্ক রিপোর্ট

পরিচয় বদলে, চেহারায় পরিবর্তন এনে, ভুয়া পরিচয় ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে প্রায় ৪৫ বছর আত্মগোপনে ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় কোর্ট মার্শালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে দীর্ঘদিন দেশ-বিদেশে অবস্থান করলেও শেষ পর্যন্ত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দীর্ঘ কয়েক মাসের গোপন নজরদারি, মানব গোয়েন্দা তথ্য ও কৌশলী অভিযানের মাধ্যমে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেফতার হন তিনি।

 

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মোজাফফরের অবস্থান সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল না। তবে ডিবির হাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ছিল—তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে (এয়ারটেল) চাকরি করেন এবং মোজাফফরের নাকের ঠিক নিচে একটি তিল বা আঁচিল রয়েছে। এই দুটি সূত্রকে কেন্দ্র করেই কয়েক মাস ধরে অনুসন্ধান চালাতে থাকে গোয়েন্দা দল।

 

ডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মোজাফফর নিজের অবয়ব, পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা এমনকি জীবনযাত্রাও বদলে ফেলেছিলেন। দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে বসবাস করায় তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু অপরাধ যত পুরোনোই হোক, কোনো না কোনো সূত্র থেকেই যায়। সেই সূত্র ধরেই শেষ পর্যন্ত তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

 

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গোয়েন্দারা প্রথমে তার মেয়ের কর্মস্থলকে কেন্দ্র করে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল ও চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য বাসার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর ওই বাসার ওপর গোপনে নজরদারি চালানো হয়। একই সঙ্গে আগে থেকে সংরক্ষিত থাকা শারীরিক বৈশিষ্ট্য—নাকের নিচের তিল—অভিযানের প্রধান শনাক্তকরণ সূত্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

 

বুধবার গভীর রাতে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করা হয়। ডিবির সদস্যরা ছদ্মবেশে বাসার দরজায় কড়া নাড়ে এবং নিজেদের টেলিকম প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয় দিয়ে তার মেয়ের সঙ্গে দেখা করার কথা বলেন।

 

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে এক বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি সামনে এলে গোয়েন্দারা কৌশলে তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেই বলেন, “আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।” একই সময়ে কর্মকর্তাদের চোখে পড়ে তার নাকের নিচের সেই পরিচিত তিল। এতেই নিশ্চিত হন তারা।

 

মুহূর্তের মধ্যেই গোয়েন্দারা তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গ্রেফতার করেন। প্রায় ৪৫ বছর ধরে আত্মগোপনে থাকা এই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির পলাতক জীবনের সেখানেই অবসান ঘটে।

 

গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, গ্রেফতার এড়াতে মোজাফফর দীর্ঘ সময় ভারতে ছদ্মনামে অবস্থান করেন। নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে ভুয়া নাম, পরিচয়পত্র ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করেন। পরে ভুয়া নথির ভিত্তিতে পাসপোর্ট তৈরি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ভ্রমণ করেন। জীবনের শেষভাগে অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফিরে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় সাধারণ এক বৃদ্ধ হিসেবে বসবাস শুরু করেন। আশপাশের কেউই তার প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানতেন না।

 

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মোজাফফর হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ছিলেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জুডিশিয়াল প্রসেসের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর কোর্ট মার্শালে মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেনের মৃত্যুদণ্ড হয়। তবে রায়ের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ডিবির পরিকল্পিত ও কৌশলী অভিযানে তার পলাতক জীবনের অবসান ঘটে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর