রাষ্ট্রপতি জিয়াকে প্রথম গুলি করেন মোজাফফর!

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রায় সাড়ে চার দশক আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। 

 

মামলার তদন্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলিটি তিনিই করেছিলেন। দীর্ঘ ৪৫ বছর ছদ্মবেশে দেশ-বিদেশে পালিয়ে থাকার পর রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

 

গোয়েন্দাদের দাবি, মোজাফফরকে শনাক্ত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তার মেয়ের কর্মস্থল এবং নাকের নিচে থাকা একটি জন্মদাগ। কয়েক মাস ধরে গোপন নজরদারি, মানব গোয়েন্দা তথ্য এবং কৌশলগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর বুধবার গভীর রাতে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে তাকে আটক করা হয়।

 

তদন্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালের ৩১ মে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন। তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে গঠিত কিলিং স্কোয়াডের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। পরবর্তীতে সামরিক তদন্ত ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়। তাদের অন্যতম ছিলেন মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন। তবে ঘটনার পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং প্রায় ৪৫ বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে ছিলেন।

 

মামলার তদন্ত বিবরণীতে বলা হয়েছে, হামলার সময় মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সরাসরি রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। মোজাফফরই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোন করে ইংরেজিতে জানান, “The President has been killed.”

 

অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর গ্রেফতার হন এবং পরে নিহত হন। তবে মোজাফফর হোসেন ও তার সহযোগী মেজর এস এম খালেদ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ পলাতক জীবন।

 

ডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এত দীর্ঘ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে মোজাফফর নিজের পরিচয়, চেহারা, পোশাক, চলাফেরা এমনকি জীবনযাত্রাও সম্পূর্ণ বদলে ফেলেন। তিনি দীর্ঘদিন ভারতে ভুয়া পরিচয়ে অবস্থান করেন। জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে নতুন পরিচয়ে বসবাস করেন এবং পরে ভুয়া পাসপোর্টের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও যাতায়াত করেন। ফলে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল দীর্ঘদিন তার কোনো সন্ধান পায়নি।

 

গোয়েন্দারা জানান, অভিযানের সূত্রপাত হয় তার মেয়ের কর্মস্থলকে কেন্দ্র করে। জানা যায়, তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল ও চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা সম্ভাব্য বাসার অবস্থান শনাক্ত করেন। একই সঙ্গে আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকা মোজাফফরের নাকের নিচের একটি তিল বা আঁচিলকে প্রধান শনাক্তকরণ সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

 

বুধবার গভীর রাতে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করা হয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিজেদের টেলিকম প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয় দিয়ে বাসার দরজায় কড়া নাড়েন এবং তার মেয়ের খোঁজ করেন। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলে কর্মকর্তারা তার নাকের নিচের জন্মদাগটি লক্ষ্য করেন। পরে পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেই বলেন, “আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।” এতেই নিশ্চিত হন গোয়েন্দারা। মুহূর্তের মধ্যেই তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গ্রেফতার করা হয়।

 

গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, আত্মগোপনের সময় তিনি নিজের আসল পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলেছিলেন। দীর্ঘ ৪৫ বছরে পুরোনো পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন এবং পারিবারিক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন, যাতে কোনোভাবেই তার অবস্থান শনাক্ত করা না যায়। জীবনের শেষভাগে তিনি অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফিরে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় একজন সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ হিসেবে বসবাস শুরু করেন। আশপাশের মানুষও জানতেন না, তাদের প্রতিবেশীই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি।

 

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, “তিনি একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ছিলেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জুডিশিয়াল প্রসেসের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে।”

 

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতে অবস্থানকালে মোজাফফর ভুয়া নাগরিকত্ব ও জাল নথির মাধ্যমে পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন। সেই পরিচয়ে তিনি বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন এবং দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানব গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ৪৫ বছর পর আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার এই দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে।

 

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘প্রথম গুলি করা’ সংক্রান্ত তথ্য মামলার তদন্ত নথি ও গোয়েন্দা সূত্রে বর্ণিত অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted