হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কোটি কোটি টাকার দান, মানত ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সামনে এসেছে।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে দানবাক্স খুলে মাত্র ২৫ দিনে ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭০২ টাকা নগদ, ১২টি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার এবং মানতের ৬৫টি ছাগল পাওয়ার পর মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যা আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে।
জানা গেছে, প্রায় ৭০০ বছর ধরে মাজারের দানবাক্স ও ডেক থেকে সংগ্রহ হওয়া অর্থের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব বা সরকারি তদারকি ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, দানের টাকা বস্তাভর্তি করে প্রভাবশালী একটি চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। এসব অভিযোগের পর গত ১৮ জুন জেলা প্রশাসন মাজারের তিনটি ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে এবং সিসিটিভির আওতায় আনে।
এরপর ২২ জুন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বসাধারণের উপস্থিতি ও সিসিটিভি নজরদারির মধ্যে দানবাক্স খোলা হয়। প্রথম দফায় চার দিনের দানে পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পরে ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় ১৯ দিনের দান গণনা করে পাওয়া যায় আরও ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। সব মিলিয়ে মাত্র ২৫ দিনেই দানবাক্সে জমা পড়ে ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭০২ টাকা। পাশাপাশি পাওয়া যায় ১২টি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার, বিভিন্ন চিঠি, চিরকুট এবং মানতের ৬৫টি ছাগলসহ গবাদিপশু।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অতীতে মাজারে দানের অর্থ কোথায় জমা হতো, কীভাবে ব্যয় করা হতো কিংবা কত টাকা উঠত—এসবের কোনো স্বচ্ছ হিসাব ছিল না। সেই কারণে বর্তমানে দান সংগ্রহ ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দানবাক্স সিলগালা হওয়ার পর দানের অর্থ কম দেখানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। অনেক ভক্তের কাছ থেকে দানবাক্সে না ফেলে সরাসরি হাতে দান নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, নারী ইবাদতখানা বন্ধ রাখার কারণেও দানবাক্সে অর্থ কম জমা পড়ছে।
মাজার পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, খাদেম ও মোতাওয়াল্লিদের আয়ের অন্যতম বড় উৎস হলো মাজারের দানবাক্স, সম্পত্তি, দোকানপাট, মার্কেট ও পুকুর থেকে পাওয়া আয়। এছাড়া দেশি-বিদেশি ভক্তদের ব্যক্তিগত নজরানা, স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রাও অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে শাহজালাল (রহ.) মাজারের নামে স্থাপিত দানবাক্স থেকেও বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়, যা নির্দিষ্ট একটি চক্রের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়।
মানতের পশু নিয়েও রয়েছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, ভক্তদের দেওয়া গরু-ছাগল পুনরায় নতুন মানতের পশু হিসেবে বিক্রি করা হয়। কোনো কোনো পশু একাধিকবার বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, প্রায় ৫০০ খাদেমের মধ্যে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দৈনিক আয় নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন ফজর থেকে পরদিন ফজর পর্যন্ত একজন খাদেমের দায়িত্বকাল বা ‘বারি’ থাকে। এই সময়ে দান, মানত, পশু জবাইসহ বিভিন্ন খাত থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ছুটির দিনে ১০ লাখ টাকারও বেশি আয় হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া মাজার এলাকায় পকেটমার, ছিনতাইকারী, জুতাচোর ও প্রতারক চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছায়।
মানতের পশু জবাই ও রান্নার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা নেওয়ার পাশাপাশি পশুর মাংস, চামড়া ও অন্যান্য অংশ আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ভক্তদের দেওয়া গিলাফ ও গোলাপজল নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভক্তরা চলে যাওয়ার পর এসব গিলাফ ও গোলাপজল সরিয়ে আবার নতুন করে অন্য ভক্তদের কাছে বিক্রি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, মাজারের যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। তিনি দাবি করেন, মাজারের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্তরা সবসময় কাজ করছেন এবং পকেটমার বা প্রতারকদের প্রতিহত করার চেষ্টা করা হয়।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করা সম্ভব নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। কমিশনের অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান শুরু হবে।
অন্যদিকে সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাজারের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
মাজারের দান, মানত, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।









