রাজধানীর যানজট নিরসন এবং উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুরুতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭০৪ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় বেড়েছে ৪২৩ কোটি টাকা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, ইউটিলিটি স্থানান্তর, নতুন অবকাঠামো সংযোজন এবং বিভিন্ন কর-ভ্যাট সমন্বয়ের কারণে ব্যয় বেড়েছে। যদিও নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতিও হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে এক্সপ্রেসওয়ের কিছু অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আগস্টেই খুলছে ধউর-আশুলিয়া সার্ভিস লেন
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার অংশে নির্মিত দুটি সার্ভিস লেন সেতুর কাজ প্রায় শেষ। ইতোমধ্যে পিচঢালাই সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে রোড মার্কিংয়ের কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই সেতু দুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
সার্ভিস লেন চালু হলে নিচের বিদ্যমান সড়ক বন্ধ করে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ভায়াডাক্ট নির্মাণকাজ শুরু হবে। একই সঙ্গে পুরোনো সেতুগুলো অপসারণ করা হবে। তুরাগ নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বজায় রাখতে এ অংশে নিচে কোনো স্থায়ী বাঁধ বা সড়ক রাখা হবে না।
দৃশ্যমান অগ্রগতি
প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ দৃশ্যমান অগ্রগতি পেয়েছে। বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, কামারপাড়া ও ধউর পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে পিলার, স্প্যান, ডেক স্ল্যাব ও ব্যারিয়ার নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এছাড়া ধউর মোড়ে গাবতলী, উত্তরা ও আশুলিয়া-বাইপাইলমুখী সংযোগে বড় আকারের ইন্টারচেঞ্জ ও র্যাম্প নির্মাণের কাজও দ্রুত এগোচ্ছে। অন্যদিকে আশুলিয়া বাজার থেকে বাইপাইল এবং শ্রীপুর পর্যন্ত অংশেও পিলার, স্ল্যাব ও ব্যারিয়ার নির্মাণ দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, নতুন সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর দুই বছরের ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) চলবে।
এক লাফে বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়
২০১৭ সালে অনুমোদনের সময় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সম্প্রতি একনেকের অনুমোদনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় আরও ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম জানিয়েছেন, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, ইউটিলিটি স্থানান্তর, ভ্যাট-ট্যাক্স সমন্বয় এবং নতুন পাঁচটি উপাদান সংযোজনের কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে।
পুনর্মূল্যায়নের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেছেন, শুরুতে যে ব্যয়ে প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, এখন অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় যুক্ত হওয়ায় এর আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তার মতে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় একটি পোস্ট-ইভ্যালুয়েশন বা পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা যাচাই করা উচিত।
উল্লেখ্য, ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে থাকবে ১৪টি র্যাম্প, ১.৯৫ কিলোমিটার উড়ালপথ, ২.৭২ কিলোমিটার সেতু, ১৪.২৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৮ কিলোমিটার ড্রেনেজ-ডাক্ট। প্রকল্পটি চালু হলে ঢাকা ও দেশের উত্তরাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াতে সময় ও যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেএইচএম/কান্ট্রিবিডি









