বিসিসির প্রকল্পে ব্যয়ের ২৩ শতাংশই অনিয়মের অভিযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট

সরকারি প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, কেন্দ্র থেকে মাঠ প্রশাসনের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভার্চুয়াল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত জাতীয় ভিডিও কনফারেন্সিং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে বড় ধরনের অডিট আপত্তি উঠেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) পরিচালিত প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের প্রায় ২৩ শতাংশ অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অডিট কর্তৃপক্ষ।

অডিট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৫৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে বিভিন্ন খাতে মোট ১৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার ব্যয় নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। যদিও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, অধিকাংশ আপত্তির বিপরীতে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও নথিপত্র ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি আপত্তি নিষ্পত্তিও হয়েছে।

২০২১ সালে শুরু, ব্যয় বেড়ে ৬০ কোটির কাছাকাছি

সরকারি দফতরগুলোর মধ্যে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ২০২১ সালে ‘ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। পরে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকায়। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভিডিও কনফারেন্সিং সুবিধা উন্নত করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ডাটা সেন্টারে কন্ট্রোল ইউনিট স্থাপন, স্যাটেলাইটভিত্তিক ব্যাকআপ ব্যবস্থা, মোবাইল স্যাটেলাইট ভ্যান, আধুনিক ক্যামেরা, ডিজিটাল বোর্ড এবং উন্নত যোগাযোগ সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, এ অবকাঠামোর মাধ্যমে ইতোমধ্যে হাজার হাজার সভা, সরকারি অনুষ্ঠান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এতে ভ্রমণ ব্যয়, সময় এবং জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে।

৯টি অডিট আপত্তিতে জড়িত ১৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা

অডিট প্রতিবেদনে মোট ৯টি বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আপত্তি সরকারি ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে। অডিটের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় বিধিমালার নির্ধারিত ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ না করে দরপত্র দলিল প্রস্তুত ও ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।

এছাড়া অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় বেশি দামে পণ্য ক্রয়, প্রযোজ্য কর ও ভ্যাট যথাযথভাবে কর্তন না করা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, সেবা গ্রহণের পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই বিল পরিশোধ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত আপত্তিগুলোর একটি হলো মোবাইল স্যাটেলাইট ভ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। অডিট বিভাগের দাবি, রক্ষণাবেক্ষণ সেবা যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যা সরকারের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এ ছাড়া কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার বা সংযুক্ত না থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যয় অনুমোদনের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং বিমা প্রিমিয়াম যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে অডিট বিভাগ।

ব্যয় বেড়েছে ২৬ শতাংশ, বাড়ানো হয়েছে মেয়াদও

প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিকল্পনা ও প্রকল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়লে তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান প্রকল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ক্রয় ব্যবস্থাপনা ও নথি সংরক্ষণে দুর্বলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অর্থ নিয়ে অডিট আপত্তি ওঠা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তবে অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি প্রমাণিত নয়। এটি প্রশাসনিক দুর্বলতা, নথি সংরক্ষণে ঘাটতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অসতর্কতা অথবা ক্রয় প্রক্রিয়ায় ত্রুটির ইঙ্গিত হতে পারে।

সম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও প্রশ্ন

অডিট প্রতিবেদনে প্রকল্পের আওতায় কেনা কিছু সম্পদের তালিকা, সংরক্ষণ ও হস্তান্তর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার বিষয়ও উঠে এসেছে। সরকারি আর্থিক বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি সম্পদের জন্য পৃথক নিবন্ধন, অবস্থান, ব্যবহারকারী কর্মকর্তা এবং হস্তান্তর সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরবর্তীতে এসব সম্পদে প্রকল্পের নামসংবলিত স্টিকার লাগানো হয়েছে এবং হালনাগাদ সম্পদ নিবন্ধন প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা

অডিট আপত্তির জবাবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অধিকাংশ পর্যবেক্ষণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা, চুক্তিপত্র, বিল-ভাউচার, কার্যসম্পাদনের সনদ এবং অন্যান্য সহায়ক নথি ইতোমধ্যে অডিট অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে। কয়েকটি আপত্তি নিষ্পত্তিও হয়েছে এবং বাকি বিষয়গুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তাদের দাবি, করোনা-পরবর্তী সময়ে সরকারি কার্যক্রম সচল রাখা, জরুরি সভা পরিচালনা এবং কেন্দ্র থেকে জেলা-উপজেলার সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। ফলে কিছু প্রশাসনিক জটিলতা বা নথিপত্রের ঘাটতি থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না।

দ্রুত আপত্তি নিষ্পত্তির নির্দেশ

পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সেক্টর-৭-এর পরিচালক (উপসচিব) মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা নিয়মিত আয়োজন, অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং হালনাগাদ তথ্য আইএমইডিতে পাঠানোর জন্য প্রকল্প পরিচালকের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) প্রস্তুতের সুবিধার্থে ই-পিএমআইএস সফটওয়্যারে প্রকল্প ব্যয়ের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখা এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত ছকে পিসিআর আইএমইডিতে পাঠানোর বিষয়েও তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি প্রশাসনের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে বিপুল অর্থের ব্যয় নিয়ে ওঠা অডিট আপত্তি এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজরে। আপত্তিগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং প্রকল্পের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টি আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

জেএইচএম/কান্ট্রিবিডি

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর