জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন, পুনর্বাসন এবং হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘জুলাই শহীদদের হত্যাকারীদের বিচার এ দেশের মাটিতেই হবে। রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে শহীদদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করবে, একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অন্যায় হয়েছে, সেই অন্যায়ের বিচারও এই দেশের আইনেই সম্পন্ন হবে।’
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। সরকার শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান, স্বীকৃতি, জীবনমান উন্নয়ন, পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে যে অন্যায় ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের কষ্ট আমি অনুভব করি। তবে বিচার করতে গিয়ে যেন কারও প্রতি অন্যায় না হয়, সে বিষয়েও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের অর্জন নয়। এটি দেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের সম্মিলিত ত্যাগের ফসল। তাই বিভাজন নয়, জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে।’
আবেগঘন বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি যদি আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, অন্যায়ের প্রতিশোধ নেব কি না—আমার বিশ্বাস, তিনি বলতেন দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাও। আমার ভাইও একই কথাই বলতেন।’
জুলাই আন্দোলনে নিহত শিশুদের স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু শহীদ হয়েছিল। তাদের কোনো অপরাধ ছিল না। কিন্তু স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে তারাও প্রাণ দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হলেও আমার হিসাবে শুধু জুলাই আন্দোলনেই প্রায় ২ হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’
শহীদ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনজনকে হারানোর বেদনা কখনো পূরণ হবে না। কিন্তু আমরা যদি সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, তাহলে একদিন গর্ব করে বলতে পারবেন—আপনাদের প্রিয়জনের আত্মত্যাগ দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য এই দেশ, এই দেশের জনগণ এবং এই দেশের মাটি। জুলাই শহীদ ও যোদ্ধাদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে তাদের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের জন্য আত্মত্যাগ, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন। পরে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীর হাতে স্মারক প্রদান করা হয়।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়নমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ বিভিন্ন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জুলাই যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও বেদনার কথা তুলে ধরেন। সন্তান ও স্বজন হারানোর স্মৃতিচারণে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। সরকারিভাবে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪ জন। তবে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের নিহত হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।









