প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে আর কখনো যেন ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং দেশ কোনোভাবেই তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত না হয়— এ প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় ঐক্য রয়েছে। যেকোনো মূল্যে এই ঐক্য অটুট থাকবে বলেও তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বুধবার (১৫ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতীয় সংসদের রীতি অনুযায়ী মতের ভিন্নতা থাকবে, তবে শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়পরায়ণতার চর্চাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে।”
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান
দুর্নীতি দমনকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারী আমলে প্রতিবছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে। এই দুর্নীতিই দেশের নানা সমস্যার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, “যেকোনো উপায়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। হাত বেঁধে হোক কিংবা টুঁটি চেপে ধরে— দুর্নীতিকে রুখতেই হবে।”
১০ হাজার পুলিশ নিয়োগের পরিকল্পনা
জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, এ লক্ষ্যে সরকার ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে।
নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, কৃষিঋণ মওকুফ, বেকারদের কর্মসংস্থান, জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর এবং কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ। তিনি বলেন, “এসব কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য
ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সম্পদ বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে বিনিয়োগ। তার ভাষায়, “আমাদের পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে।”
বিশ্ব সংকটেও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি
বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের তরুণ, কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার ওপর সরকারের আস্থা রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায়ভিত্তিক সুযোগ সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘোষণা
জুলাই সনদের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন, তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতি সরকার সম্পূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি বলেন, “জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ ও অক্ষর বাস্তবায়নে আমাদের সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
ভবিষ্যতে স্বৈরাচার ও তাঁবেদারি রাজনীতি ঠেকাতে রাষ্ট্র ও জনগণকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনেরও আহ্বান জানান।
এ সময় বাজেট অধিবেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংসদ সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার জন্য ডেপুটি স্পিকারের প্রতি অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, গত ৭ জুন শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।









