১৭২ আবেদন, অনুমোদন মাত্র ৩৯: ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুতে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট

ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে (পবিস) মিনি ঠিকাদার তালিকাভুক্তিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সিন্ডিকেট এবং আর্থিক লেনদেন সহ অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি, সরকারি নীতিমালা ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) নির্দেশনা উপেক্ষা করে গোপনে পছন্দের মাত্র ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে সাময়িক তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অথচ প্রাথমিকভাবে অনুমোদন পাওয়া ১৭২টি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।

ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদারদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। তাদের কারণে যোগ্য অনেক প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হয়েছে এবং সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদ্যুৎসেবায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, স্বল্প দৈর্ঘ্যের বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডেশন কাজের জন্য ২০২৫ সালের ৬ মে মিনি ঠিকাদার প্রাথমিক তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয় ৫ হাজার টাকা এবং ১৫ মে পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, বিজ্ঞপ্তিতে আরইবির নির্দেশিকা (১০০-৫২) অনুযায়ী না থাকা কয়েকটি অতিরিক্ত শর্ত সংযোজন করা হয়। এর মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুপারভাইজার ও লাইনম্যানের সনদ বাধ্যতামূলক করা এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।

ভুক্তভোগীদের দাবি, শুরু থেকেই নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতেই এসব শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল।আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে মোট ১৭৬টি আবেদনের মধ্যে ১৭২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দেয় রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গ্রহণ করে সাময়িক তালিকাভুক্তির জন্য প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর থেকেই শুরু হয় অনিয়ম। প্রাথমিকভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে কোনো নোটিশ না দিয়ে দিনের পর দিন অফিসে ঘোরানো হয়। অনেক ঠিকাদার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, এ সময় পল্লী বিদ্যুতের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পূর্বে তালিকাভুক্ত কিছু ঠিকাদারকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হিসেবে ডিজিএম (কারিগরি) প্রকৌশলী মো. লুৎফুল হাসান সরকারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রভাব বিস্তার করেন এবং পুরো তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন।

তাদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর গোপনে মাত্র ৩১টি প্রতিষ্ঠানের সাময়িক তালিকাভুক্তির প্রস্তাব রংপুরে পাঠানো হয়। বিষয়টি জানতে পেরে রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সব প্রাথমিক অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করে ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ আবারও একই ৩১টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে ১০ মে ওই ৩১টি এবং ২১ মে আরও ৮টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

এ ঘটনায় তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান, ডিজিএম (কারিগরি) মো. লুৎফুল হাসান সরকার, সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ই অ্যান্ড সি) নাহিদ ইসলামসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদাররা।

ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও আরাফাত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এনামুল হক বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডারের মাধ্যমে সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছি। এবারও নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেছি। কিন্তু আমাকে বাদ দিয়ে দূরের জেলার প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এজিএম নাহিদ ইসলাম আমাকে উচ্চ পর্যায়ের সুপারিশ আনতে বলেছিলেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক তদবির ও সিন্ডিকেটের কারণে অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হয়েছে।”

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ই অ্যান্ড সি) নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নির্দেশ অমান্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, “সেখানে ইঞ্জিনিয়াররাই বিষয়টি দেখাশোনা করেন। আমি সেখান থেকে চলে আসার চার-পাঁচ মাস হয়ে গেছে। বিষয়টি আমার মনে নেই। আমি চলে আসার পর সেখানে আরও একজন জিএম ছিলেন, তিনি বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন বলে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।”

ডিজিএম (কারিগরি) মো. লুৎফুল হাসান সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ঠিকাদার তালিকাভুক্তির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ হ্যান্ডেল করেন। এখানে আমার কোনো হাত নেই। যাচাই-বাছাই কমিটিতে আমি শুধু একজন সদস্য ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।”

তিনি আরও বলেন, “ঠিকাদার তালিকাভুক্তির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না। তবে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কথা উল্লেখ করেছেন। আর সাময়িক তালিকাভুক্তির জন্য অন্যদের কাগজপত্র গ্রহণ না করার বিষয়টি অফিস প্রধানের এখতিয়ার। এখানে আমার কিছু করার ছিল না।”

বর্তমান জেনারেল ম্যানেজার মো. আশরাফুল আলম খান বলেন, “মিনি ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টি অতীতের। ১৭২টি আবেদনের মধ্যে ৩৯টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়েছে। আগে কীভাবে হয়েছে, তা আমার জানা নেই।”

অনিয়ম দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, “আমি নতুন করে আর কোনো কাগজপত্র জমা নেব না। তবে অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”

অন্যদিকে রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, “মোট ১৭৬টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৭২টি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র সঠিক থাকায় প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর জিএম শাখাকে সব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সাময়িক তালিকাভুক্তির প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা মাত্র ৩১টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠায়। পরে আবারও সব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের কোথাও কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা নেই। যারা প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত হয়েছেন, তারা যেকোনো সময় সাময়িক তালিকাভুক্তির জন্য কাগজপত্র জমা দিতে পারেন। বর্তমানে জিএম শাখায় জানতে চাইলে তারা বলছেন, নতুন করে কেউ কাগজ জমা দেননি।”

নিজের নির্দেশনা অমান্যের বিষয়ে তিনি বলেন, “আপনাদের কাছে যে অভিযোগ এসেছে, একই অভিযোগ আমার কাছেও এসেছে। কিন্তু লিখিত ও কোনো রেকর্ড প্রমাণ না থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারছি না। আমি দুইবার নির্দেশনা দিয়েছি, কিন্তু তারা তা বাস্তবায়ন করেনি। কেন গড়িমসি করছে, সেটি আমার জানা নেই।”

এছাড়াও তিনি বলেন, “১৭২টি প্রতিষ্ঠানই সাময়িক তালিকাভুক্ত হলেও কোনো সমস্যা নেই। যার ইচ্ছা সে কাজ করবে। ঠিকাদারের সংখ্যা বাড়লে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।”

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি, সাময়িক তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন জমা দিতে গেলে অনেকের আবেদন গ্রহণ করা হয়নি এবং বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করা হয়েছে। এবিষয়ে লিখিত অভিযোগ করলে ভবিষ্যতে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।

তাদের আশঙ্কা, মাত্র ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত রাখলে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার প্রায় ২০ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎসেবায় ভোগান্তির মুখে পড়বেন। বিদ্যুৎ সংযোগ, লাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে অযৌক্তিক বিলম্ব, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং গ্রাহক হয়রানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিবছর নবায়ন ফি থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হবে।

উল্লেখ্য, এর আগেও ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিরুদ্ধে ঘুষ, অতিরিক্ত বিল আদায়, টেন্ডার অনিয়ম, দীর্ঘ লোডশেডিং এবং ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদাররা নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং প্রাথমিকভাবে অনুমোদন পাওয়া সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বিধি অনুযায়ী সাময়িক তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর