স্পোর্টস ইনজুরি এড়াতে করণীয়

ডা. তাহমীদ কামাল

চলছে বিশ্বকাপফুটবল। বিশ্বব্যাপী ক্রীড়ামোদিদের কাছে এটি আকাঙ্ক্ষিত আয়োজন। এমনিতেই বিশ্বকাপ মানেই উত্তেজনা, প্রতিযোগিতা এবং অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্যের প্রদর্শন। হোক সেটা ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা যে কোনো খেলা।

এর পেছনে থাকে খেলোয়াড়দের কঠোর শারীরিক পরিশ্রম এবং ইনজুরির ঝুঁকি। বিশেষ করে ফুটবলে দ্রুতগতি, হঠাৎ দিক পরিবর্তন, শারীরিক সংঘর্ষ এবং অতিরিক্ত চাপের কারণে খেলোয়াড়রা বিভিন্ন ধরনের আঘাতের শিকার হতে পারেন। অন্য খেলাতেও প্রায়ই ‘স্পোর্টস ইনজুরি’র শিকার হন।

স্পোর্টস ইনজুরি বলতে খেলাধুলার সময় পেশি, লিগামেন্ট, টেন্ডন, হাড় বা জয়েন্টে আঘাত হওয়াকে বোঝায়। ফুটবলে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি, অ্যাঙ্কেল স্প্রেইন, হাঁটুর ACL (Anterior Cruciate Ligament) ইনজুরি, ক্রিকেটে কাঁধ, কোমর, পিঠ, হাত ও আঙুলের ইনজুরি বেশি দেখা যায়।

* ইনজুরির সাধারণ কারণ

খেলাধুলাজনিত আঘাতের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন-

▶ পর্যাপ্ত ওয়ার্ম-আপ না করা

▶ অতিরিক্ত অনুশীলন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব

▶ ভুল কৌশলে খেলা

▶ আগের ইনজুরি পুরোপুরি ভালো হওয়ার আগে মাঠে ফেরা

▶ শরীরের সক্ষমতার চেয়ে বেশি চাপ নেওয়া

▶ খেলাধুলার নিয়ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সঠিকভাবে অনুসরণ না করা।

 

* আঘাতের পর প্রাথমিক চিকিৎসা-RICE Protocol

খেলার সময় হঠাৎ আঘাত লাগলে প্রথমে কিছু পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ পেশি, লিগামেন্ট বা জয়েন্টের আঘাতে প্রাথমিকভাবে RICE protocol অনুসরণ করা হয়।

▶ R-Rest (বিশ্রাম) : আঘাতের পর খেলাধুলা বন্ধ করে আক্রান্ত অংশকে বিশ্রাম দিতে হবে। ব্যথা থাকা অবস্থায় খেলা চালিয়ে গেলে ইনজুরি আরও গুরুতর হতে পারে।

▶ I-Ice (বরফ) : আঘাতের স্থানে কাপড় দিয়ে মোড়ানো বরফ ১৫-২০ মিনিট করে প্রয়োগ করা যায়। এতে ব্যথা, প্রদাহ এবং ফোলা কমাতে সাহায্য করে।

▶ C-Compression (চাপ দিয়ে বাঁধা) : ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে বাঁধলে ফোলা কমতে পারে। তবে অতিরিক্ত শক্ত করে বাঁধা যাবে না, কারণ এতে রক্ত চলাচল ব্যাহত হতে পারে।

▶ E-Elevation (উঁচু করে রাখা) : আহত হাত বা পা হৃৎপিণ্ডের চেয়ে কিছুটা উঁচু করে রাখলে ফোলা কমাতে সাহায্য করে।

 

* মাঠে খেলোয়াড় হঠাৎ অজ্ঞান হলে করণীয়

খেলার সময় হঠাৎ অজ্ঞান হওয়া একটি জরুরি অবস্থা। এর পেছনে মাথায় আঘাত, পানিশূন্যতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, হার্টের সমস্যা বা অন্য কোনো গুরুতর কারণ থাকতে পারে। এসময় দ্রুত করণীয়-

▶ খেলা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করতে হবে

▶ খেলোয়াড় সাড়া দিচ্ছে কি না পরীক্ষা করতে হবে

▶ শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে কি না দেখতে হবে

▶ শ্বাস না থাকলে বা স্বাভাবিক না হলে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিয়ে CPR শুরু করতে হবে

▶ শ্বাস থাকলে তাকে নিরাপদ অবস্থায় শুইয়ে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে

▶ মাথায় আঘাতের সন্দেহ থাকলে ঘাড় ও মেরুদণ্ড অপ্রয়োজনে নাড়াচাড়া করা যাবে না

▶ বমি হলে শ্বাসনালি বন্ধ হওয়া প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে

▶ খেলোয়াড় সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে মাঠে ফিরতে দেওয়া যাবে না।

 

* কনকাশন (Concussion) : মাথায় আঘাতের গুরুত্ব

ফুটবল বা অন্যান্য খেলায় মাথায় আঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আঘাতের পর মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা, অস্বাভাবিক আচরণ, স্মৃতির সমস্যা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কনকাশনের লক্ষণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

 

* কখন দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন

নিচের যে কোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন-

▶ দীর্ঘ সময় অজ্ঞান থাকা

▶ খিঁচুনি হওয়া

▶ মাথায় আঘাতের পর বিভ্রান্তি বা স্মৃতির সমস্যা

▶ বুক ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট

▶ বারবার অজ্ঞান হওয়া

▶ তীব্র ব্যথা বা অঙ্গের আকৃতি পরিবর্তন হওয়া

▶ দুর্বলতা বা অবশভাব তৈরি হওয়া।

 

* ইনজুরি প্রতিরোধে করণীয়

একজন খেলোয়াড়ের সাফল্যের জন্য শুধু দক্ষতা নয়, প্রয়োজন সুস্থ শরীর ও সঠিক প্রস্তুতি। নিয়মিত ফিটনেস অনুশীলন, শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, সঠিক ওয়ার্ম-আপ এবং প্রশিক্ষকের নির্দেশনা মেনে চলা ইনজুরির ঝুঁকি কমাতে পারে। খেলার মাঠে আমরা দেখি গোল, জয় এবং রেকর্ড; কিন্তু প্রতিটি সাফল্যের পেছনে থাকে একজন খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতা, চিকিৎসা দলের সহযোগিতা এবং সঠিক পুনর্বাসন। নিরাপদ খেলাধুলাই পারে খেলোয়াড়কে দীর্ঘদিন তার সেরা পারফরমেন্স দেওয়ার সুযোগ

করে দিতে।

লেখক : ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ, অটোয়া, কানাডা।

সৌজন্যে : যুগান্তর

 

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর