হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে মঙ্গলবার ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এ ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাব হিসেবে এই ‘শক্তিশালী’ অভিযান চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক নৌপরিবহনে হামলার জন্য ইরানকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে বলেও সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় কেশম দ্বীপে অন্তত ছয়টি, সিরিক শহরে সাতটি এবং বন্দর আব্বাস এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক বারবার লঙ্ঘন করছে যুক্তরাষ্ট্র। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং চুক্তি লঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা প্রত্যাহার করে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জুন মাসে দেওয়া একটি লাইসেন্স বাতিল করেছে, যার আওতায় ইরান ২১ আগস্ট পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহ করতে পারত।
মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তবে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে মার্কিন আলোচকরা এখনো ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ কাজ করে যাচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, রাতে একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর আগুন ধরে যায়। পরে আরও দুটি জাহাজে হামলা হয়, যার অন্তত একটিতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। তিনটি জাহাজই ওমান উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় হামলার শিকার হয়।
কাতার জানিয়েছে, আক্রান্ত জাহাজগুলোর একটি ছিল তাদের এলএনজি ট্যাংকার আল-রেকাইয়াত। এ ঘটনার জন্য তারা সরাসরি ইরানকে দায়ী করে এটিকে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের ওপর ‘অগ্রহণযোগ্য’ হামলা হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। পরে দোহা ইরানের উপ-রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় এবং ঘটনার ব্যাখ্যা দাবি করে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এই হামলা এবং এর সব ক্ষয়ক্ষতি ও পরিণতির জন্য আইনগতভাবে ইরানই দায়ী।
তবে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা কাতারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছে।
নতুন করে উদ্বেগ
এক সপ্তাহের বেশি সময়ের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে নতুন এই হামলায় আবারও হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, হরমুজ প্রণালী ব্যবহারে ইরানের বিকল্প কোনো ব্যবস্থাকে তেহরান মেনে নেবে না—এই বার্তাই নতুন হামলার মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে। তাঁর মতে, ঘটনাটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
উল্লেখ্য, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালীতে ধীরে ধীরে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। তবে ইরান আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় আর ফিরে যাওয়া হবে না এবং জলপথ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো নির্ধারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন।
সূত্র: বাসস









