ঠাকুরগাঁওয়ে শিশু ধর্ষণ মামলায় ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ৩ জনের যাবজ্জীবন

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:

প্রায় ১৫ বছর আগে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় সংঘটিত এক আলোচিত শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন ঠাকুরগাঁও শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে দণ্ডিতদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

রোববার (১৯ জুলাই) ঠাকুরগাঁও শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আলী মনসুর এ রায় ঘোষণা করেন।

আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের গোয়ালপাড়া এলাকার ইউনুস কসাইয়ের ছেলে মো. আনিস রানা (৩৫), মুসলিমনগর এলাকার মাইরুদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৪০) এবং ভোট কসাইয়ের ছেলে মো. দুলাল (৪৮)।

যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— পৌর শহরের মুসলিমনগর এলাকার মো. সেলিমের ছেলে মো. আনিছুর (২৯), বাংরু মোহাম্মদের ছেলে মো. খতিবুর খতু (৩২) এবং বজলুর ছেলে মো. লালু (২৬)।

আদালতের রায়ে বলা হয়, মো. আনিস রানা, মো. সাইফুল ইসলাম ও মো. দুলাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী-২০০৩)-এর ৯(৩) ধারায় দোষী প্রমাণিত হওয়ায় তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(এ) ধারা কিংবা জেল কোড অনুযায়ী কোনো ধরনের সাজা মওকুফ (রেমিশন) সুবিধা পাবেন না।

অপরদিকে, মো. আনিছুর, মো. খতিবুর খতু ও মো. লালুকে একই আইনের ৯(৩)/৩০ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, প্রত্যেককে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের বিচারাধীন অবস্থায় হাজতে থাকা সময় সাজা থেকে সমন্বয় করা হবে। তবে তারাও রেমিশনের সুবিধা পাবেন না বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর বিকেলে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী বান্ধবীর বাড়ি থেকে ফেরার পথে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় মহাসড়কের পাশে এনামুল পেট্রোল পাম্পের পেছনে কয়েকজন যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে মোবাইল ফোনে আরও কয়েকজনকে ডেকে এনে ভয়ভীতি দেখিয়ে পালাক্রমে তাকে ধর্ষণ করা হয়। এ সময় অপর আসামিরা ধর্ষণের ঘটনায় সহযোগিতা করে।

ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী এগিয়ে এলে আসামিরা তার কাপড়-চোপড় নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় ওই কিশোরী বাড়ি ফিরে পরিবারের সদস্যদের ঘটনাটি জানায়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঘটনার সময় ভুক্তভোগীর বাবা বাড়িতে না থাকায় কয়েকদিন পর ফিরে এসে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ২০১১ সালের ২৫ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে প্রায় দেড় দশক পর মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।

রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, দণ্ডিতদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। আপিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর তাদের বর্তমান সম্পদ থেকে অর্থ আদায় করা হবে। বর্তমান সম্পদ থেকে আদায় সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ থেকেও ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে।

এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী দণ্ডিতদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়ার জন্য ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পরে সেই অর্থ ভুক্তভোগীকে প্রদান করা হবে।

রায় ঘোষণার সময় আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আনিস রানা পলাতক ছিলেন। আদালত তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তার হওয়ার দিন থেকে তার সাজা কার্যকর হবে।

অন্যদিকে আদালতে উপস্থিত পাঁচ দণ্ডিত আসামিকে সাজা ভোগের জন্য কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রায়ের কার্যকরী অংশের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঠাকুরগাঁওয়ের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (স্পেশাল পিপি) অ্যাডভোকেট মো. বদিউজ্জামান চৌধুরী বাদল বলেন, “এই রায় ন্যায়সঙ্গত হয়েছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ভিকটিম ন্যায়বিচার পেয়েছে। শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, প্রায় দেড় দশক ধরে চলা এ মামলার রায়ের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে দণ্ডিতদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রির নির্দেশ ভবিষ্যতের বিচারিক নজির হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর