মার্টিনেজের দেয়াল, ফাইনাল গড়াল অতিরিক্ত সময়ে

স্পোর্টস ডেস্ক

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটেও গোলের দেখা মিলল না। তবে স্কোরলাইন যতটা নিরুত্তাপ, মাঠের লড়াই ছিল তার ঠিক উল্টো। পুরো ম্যাচে স্পেনের একের পর এক আক্রমণ, আর বিপরীতে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অবিশ্বাস্য গোলরক্ষণে বেঁচে থাকে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে রেকর্ড ১০টি সেভ করে দলকে ম্যাচে রাখেন এই গোলরক্ষক। তবে ইনজুরি সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। শেষ পর্যন্ত ১০ জনের আর্জেন্টিনাকে নিয়েই ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

শুরু থেকেই আক্রমণের ঝড় তোলে স্পেন। পঞ্চম মিনিটেই লামিন ইয়ামালের দারুণ সুযোগ লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় রুখে যায়। এরপর থেকে পুরো প্রথমার্ধজুড়েই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল লা রোজাদের দখলে।

সপ্তম মিনিটে আর্জেন্টিনা একটি সুযোগ তৈরি করলেও উনাই সিমন দ্রুত বেরিয়ে এসে লিওনেল মেসিকে গোল করতে দেননি। এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি স্পেনের হাতে চলে যায়।

প্রথম ২৩ মিনিটে আর্জেন্টিনার বল দখল ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ। মেসি, নিকো গঞ্জালেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ মিলে মাত্র ১৭ বার বলে স্পর্শ করেন। অন্যদিকে রদ্রির নেতৃত্বে স্পেনের মিডফিল্ড একচ্ছত্র আধিপত্য দেখায়।

৩৯ মিনিটে ওয়ারজাবালের জোরালো শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। দুই মিনিট পর চোটের কারণে মাঠ ছাড়েন তিনি। তার পরিবর্তে নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি।

প্রথমার্ধ শেষে বল দখলে স্পেন এগিয়ে ছিল ৬৫-৩৫ শতাংশে। পাসের সংখ্যাতেও ছিল বড় ব্যবধান—স্পেনের ৩১৩টি সফল পাসের বিপরীতে আর্জেন্টিনার ছিল মাত্র ১৫৫টি। সবচেয়ে হতাশার বিষয়, প্রথম ৪৫ মিনিটে লক্ষ্যে তো নয়ই, কোনো শটই নিতে পারেনি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

বিরতির পরও ম্যাচের চিত্র বদলায়নি। স্কালোনি নিকো গঞ্জালেজকে তুলে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নামালেও আক্রমণে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি আর্জেন্টিনা। বরং মাঠে নেমেই রদ্রিকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন পারেদেস।

৫৫ মিনিটে নিকোলাস ওতামেন্দির দুর্দান্ত ট্যাকলে নিশ্চিত বিপদ থেকে রক্ষা পায় আর্জেন্টিনা। পরের মিনিটেই ওলমোর ব্যাকপাস থেকে কুকুরেয়ার সামনে বল পৌঁছানোর আগেই গঞ্জালো মন্তিয়েল ক্লিয়ার করেন।

৬২ মিনিটে স্পেন ফাবিয়ান রুইজ ও ওয়ারজাবালকে তুলে পেদ্রি ও ফেরান তোরেসকে মাঠে নামায়। এরপরও একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে তারা। ওলমোর দূরপাল্লার শট, ইয়ামালের ক্রস থেকে তোরেসের হেড—সবই প্রতিহত করেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।

৭০ মিনিটে আর্জেন্টিনা দুটি পরিবর্তন আনে। রদ্রিগো দে পলের জায়গায় জিউলিয়ানো সিমিওনে এবং ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে ফাকুন্দো মেদিনাকে নামান কোচ লিওনেল স্কালোনি।

এই সময়ের মধ্যে বিশ্বকাপের একটি হতাশাজনক রেকর্ড গড়ে আর্জেন্টিনা। ১৯৬৬ সালে পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম ৭০ মিনিটে লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি তারা।

৭৫ মিনিটে স্পেন আরও দুটি পরিবর্তন এনে দানি ওলমো ও বায়েনার জায়গায় মিকেল মেরিনো ও নিকো উইলিয়ামসকে নামায়। এরপর আক্রমণের গতি আরও বাড়ে। ৭৭ মিনিটে পেদ্রির শট, এরপর ইয়ামালের প্রচেষ্টা, কুবার্সির দূরপাল্লার শট এবং ৮০ মিনিটে লাপোর্তের হেড—সবকিছুই অবিশ্বাস্য দক্ষতায় সামাল দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।

৮৭ মিনিটে ফেরান তোরেসের শট অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়। ইনজুরি সময়েও থামেনি স্পেনের আক্রমণ। ৯০+৩ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের শক্তিশালী শট আবারও ঠেকিয়ে দেন মার্টিনেজ।

এরপরই আর্জেন্টিনার জন্য আসে বড় ধাক্কা। কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। ফলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা।

ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় স্পেন। লামিন ইয়ামালের নেওয়া সেই দুর্দান্ত শটও ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিরিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তার রেকর্ড ১০টি সেভেই নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য থাকে ম্যাচ এবং শিরোপা নির্ধারণের লড়াই গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর