ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। মানুষের বিবেক, চরিত্র, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য ইসলাম যেসব বিষয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, তার অন্যতম হলো মদ ও সব ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য। ইসলাম শুধু মদ পান করাকেই হারাম করেনি; বরং এর উৎপাদন, পরিবহন, বিক্রি, ক্রয় এবং এ-সংক্রান্ত সব ধরনের সহযোগিতাকেও নিষিদ্ধ করেছে।
এ কারণেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ১০ শ্রেণির মানুষের ওপর লানত (অভিশাপ) করেছেন।
কুরআনের নির্দেশ: মদ শয়তানের অপবিত্র কাজ
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অর্থ:
“হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ এবং ভাগ্য নির্ধারণের শরগুলো শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাক, যাতে তোমরা সফল হতে পার।”
(সুরা আল-মায়িদাহ: ৯০)
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ
অর্থ:
“শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে চায়। অতএব, এখনো কি তোমরা বিরত হবে না?”
(সুরা আল-মায়িদাহ: ৯১)
মদের সঙ্গে জড়িত ১০ শ্রেণির মানুষের ওপর রাসুল (সা.)-এর লানত
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فِي الْخَمْرِ عَشَرَةً: عَاصِرَهَا، وَمُعْتَصِرَهَا، وَشَارِبَهَا، وَحَامِلَهَا، وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ، وَسَاقِيَهَا، وَبَائِعَهَا، وَآكِلَ ثَمَنِهَا، وَمُشْتَرِيَهَا، وَالْمُشْتَرَى لَهُ
অর্থ:
“রাসুলুল্লাহ (সা.) মদের ব্যাপারে দশ শ্রেণির মানুষের ওপর লানত করেছেন— যে তা প্রস্তুত করে, যে প্রস্তুত করায়, যে পান করে, যে বহন করে, যার কাছে বহন করা হয়, যে পরিবেশন করে, যে বিক্রি করে, যে এর মূল্য ভোগ করে, যে ক্রয় করে এবং যার জন্য তা ক্রয় করা হয়।”
(জামে তিরমিজি: ১২৯৫, ১২৯৮; সুনানে ইবনু মাজাহ: ৩৩৮০)
১. মদ প্রস্তুতকারী
যে ব্যক্তি নিজ হাতে মদ তৈরি করে বা উৎপাদন করে। ইসলামে এটি হারাম কাজ এবং এ কাজে জড়িত ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর লানতের অন্তর্ভুক্ত।
২. মদ প্রস্তুতের নির্দেশদাতা
যে অন্যকে মদ তৈরি করতে বলে, কারখানা স্থাপন করে, উৎপাদনের অর্থায়ন করে বা এর ব্যবস্থা করে।
৩. মদ পানকারী
যে ব্যক্তি নিজে মদ বা যেকোনো নেশাজাতীয় পানীয় পান করে। ইসলামে নেশা সৃষ্টি করে— এমন সব বস্তুই নিষিদ্ধ।
৪. মদ বহনকারী
যে ব্যক্তি মদ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন করে, তা ব্যবসায়িকভাবে হোক বা ব্যক্তিগতভাবে।
৫. যার জন্য মদ বহন করা হয়
যার কাছে মদ পৌঁছে দেওয়া হয় বা যার উদ্দেশ্যে মদ পরিবহন করা হয়।
৬. মদ পরিবেশনকারী
যে অন্যকে মদ পরিবেশন করে, পান করায় বা পান করার ব্যবস্থা করে।
৭. মদ বিক্রেতা
যে ব্যক্তি মদ বিক্রি করে বা মদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকে।
৮. মদের মূল্য গ্রহণকারী
যে ব্যক্তি মদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ বা লাভ গ্রহণ করে কিংবা সেই অর্থ ভোগ করে।
৯. মদ ক্রয়কারী
যে ব্যক্তি নিজের জন্য বা অন্যের জন্য মদ কিনে।
১০. যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়
যার উদ্দেশ্যে, যার অনুরোধে বা যার অর্থে মদ কেনা হয়।
কেন ইসলাম এত কঠোর?
ইসলাম মদের বিরুদ্ধে এত কঠোর অবস্থান নিয়েছে, কারণ এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক। মদ—
- মানুষের বিবেক ও বিচারবোধ নষ্ট করে।
- নামাজ ও আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
- পারিবারিক অশান্তি, সহিংসতা ও বিচ্ছেদের কারণ হয়।
- হত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, ব্যভিচারসহ নানা অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
- অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টি করে।
- শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এ কারণেই ইসলাম শুধু মদ পান নয়, বরং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ধাপকে নিষিদ্ধ করেছে, যাতে সমাজে এই অনিষ্টের বিস্তারই না ঘটে।
একজন মুমিনের করণীয়
একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো—
- নিজে মদ ও সব ধরনের মাদক থেকে বিরত থাকা।
- পরিবারকে এ বিষয়ে সচেতন করা।
- মদ বা মাদকের ব্যবসা, পরিবহন বা কোনো ধরনের সহযোগিতা থেকে দূরে থাকা।
- সমাজে মাদকবিরোধী সচেতনতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখা।
- আল্লাহর কাছে সর্বদা হারাম কাজ থেকে হেফাজতের দোয়া করা।
মদ ও সব ধরনের মাদক শুধু একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও এক ভয়াবহ অভিশাপ। তাই কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী একজন মুমিনের উচিত মদ ও মাদকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ—কোনোভাবেই জড়িত না হওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের হারাম কাজ থেকে হেফাজত করুন, কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা নসিব করুন। আমিন।









