তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ‘উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ দ্বিতীয় পর্যায়’ প্রকল্প হাতে নেয় ২০২১ সালে। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালে। পরবর্তী সময়ে দুই দফায় মেয়াদ ও বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশ। প্রকল্পের আর্থিক বিষয়ে ৪টি অডিট আপত্তি আসে- যা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো এক্সিট প্লান নেই। এ ছাড়াও রয়েছে নানা সমস্যা। এসব কারণে প্রকল্পের সুফল অর্জন অনিশ্চিত হতে পারে- এমনটাই মনে করছে সরকারের প্রকল্প তদারকি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে আসে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ২০১টি উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামের মধ্যে এখন পর্যন্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৪০টির। আরো ৪০টির কাজ চলমান থাকলেও ৯০টি স্টেডিয়ামের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। এ ছাড়া ১০টি স্টেডিয়ামের জন্য বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে জমি অধিগ্রহণের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৪ মে ২০২১ সালে একনেকে ১ হাজার ৬৪৯ কোটি ৩২ লাখ ৫২ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে বাস্তবতার নিরিখে মেয়াদকাল ২ বছর ও প্রাক্কলিত ব্যয় ১ম সংশোধনে বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৮৫৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা হয় এবং বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত নির্ধারণ করে ১ম সংশোধন অনুমোদিত হয়। সংশোধনে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১ হাজার ২০৬ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং মেয়াদকাল বৃদ্ধি হয়েছে ২৪ মাস (৫০%)। প্রকল্পটি দেশের মোট ৮টি বিভাগের ৫৮টি জেলার ২০১টি উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন আছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পসমূহ থেকে নির্বাচিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে চলমান প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে।
প্রকল্পটির প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ, মাঠ উন্নয়ন, প্যাভিলিয়ন ভবন, গ্যালারি, টয়লেট ব্লক, ড্রেনেজ, সীমানা প্রাচীর, সোলার প্যানেল, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ।
প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি উৎস ব্যবহার করে গুণগত ও পরিমাণগত উভয় পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে নির্মাণকাজের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং নির্মাণ সম্পন্ন স্টেডিয়াম, নির্মাণাধীন স্টেডিয়ামে ব্যবহৃত নির্মাণ সামগ্রীর নমুনা ল্যাব টেস্ট করে প্রাপ্ত ফলাফল প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া পণ্য ও পূর্ত কাজ ক্রয় কার্যক্রম বিশ্লেষণে ৭টি কেস স্টাডি সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রকল্পের আরডিপিপির কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৬২.৭৮ শতাংশ হবার কথা থাকলেও এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে ভৌত অগ্রগতি ৩৭ শতাংশ ও আর্থিক অগ্রগতি ৮২০ কোটি ৫৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা, ২৮.৭৪ শতাংশ। প্রকল্প বাস্তবায়নের ৫ অর্থবছরে ছাড়কৃত অর্থের পরিমাণ ৮৮৭ কোটি ৪৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা ও প্রকৃত ব্যয় ৮২০ কোটি ৫৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঠামোগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি সমস্যা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ ছাড়াই দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নিয়োগ পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন; ভূমি অধিগ্রহণ, খাস জমি হস্তান্তর, দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানে বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প সংশোধনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণের আওতা বৃদ্ধি, রেট শিডিউল পরিবর্তন, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন ও নতুন অবকাঠামোগত অঙ্গ সংযোজন, মূল ডিপিপির ১৮৬টি উপজেলা সংশোধিত হয়ে আরডিপিপিতে ২০১টিতে উন্নীত হওয়া, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে ফুটিং এর পরিবর্তে পাইল ফাউন্ডেশন নির্মাণ, ১৭৬টি উপজেলায় সীমানা প্রাচীর যুক্তকরণ, ড্রেনের কাজের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নকালে প্যাকেজের ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে কাজের পরিধি বৃদ্ধি। এ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন সম্পন্ন না করে প্রকল্প গ্রহণ কাজের পরিধি বৃদ্ধি ও বিলম্বের অন্যতম কারণ।
প্রকল্পের দুর্বল দিকগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ প্রকল্প বাস্তবায়নে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাব, নকশা পরিবর্তন, কার্যকর এক্সিট প্লান না থাকা এবং অতিরিক্ত দায়িত্বনির্ভর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন, যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণ এবং সামাজিক অপরাধপ্রবণতা হ্রাসের মাধ্যমে প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল অর্জনের উল্লেখযোগ্য সুযোগ বিদ্যমান রয়েছে। একই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, রেট শিডিউল পরিবর্তন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও টেকসই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে প্রকল্পটির সার্বিক পর্যালোচনায় অবকাঠামোগুলোর নির্মাণকাজের গুণগত মান সন্তোষজনক দেখা গেলেও নির্মাণ সম্পন্ন স্টেডিয়ামে সীমানা প্রাচীর না থাকা, ১০ শতাংশ স্টেডিয়ামে অসমতল মাঠ ও ঘাসের অভাবে খেলাধুলা ব্যাহত হওয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া মাঠ উন্নয়ন, ফিনিশিং ও রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত বিষয়ে আরও উন্নতি প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রকল্পে আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ২০২৩-২০২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারটি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছেÑ যা এখনও অনিষ্পন্ন। মাঠপর্যায়ে ক্রীড়া কার্যক্রম সচল রাখার জন্য প্রশিক্ষক ও কোচের স্বল্পতা এবং প্রকল্প সমাপ্তির পর অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে সুনির্দিষ্ট এক্সিট প্ল্যান না থাকলে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল অর্জন অনিশ্চিত হতে পারে। স্টেডিয়াম পরিচালনার নীতিমালা ২০২৫ সালে অনুমোদিত হলেও তার বাস্তবায়ন এখনও শুরু হয়নি। প্রকল্পে নির্মিত স্টেডিয়াম সরেজমিন পরিদর্শন, কেআইআই, এফজিডি ও উপকারভোগী জরিপে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পরিপ্রেক্ষিতে সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রয় কার্যক্রমে কার্যকর প্রতিযোগিতা সৃষ্টি, ত্রৈমাসিক পিআইসি/পিএসসি সভা নিয়মিত আয়োজন, চারটি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি, তথ্য নিয়মিত হালনাগাদকরণ। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ও জনবল কাঠামো পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।









