বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা দেশে ফিরে সদর্পে গড়ে তুলেছে নতুন নেটওয়ার্ক। একই সাথে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া এবং পলাতক সন্ত্রাসীরাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় থেকে চাঁদাবাজি, দখল ও মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণসহ নানা অপরাধে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এক কথায় একসময় গা-ঢাকা দেয়া এসব সন্ত্রাসীরা আবারো নিজ নিজ এলাকায় ফিরে কায়েম করছে ত্রাসের রাজত্ব। অনেকেই রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের ইশারার অপেক্ষায়। দেশে ফেরা কিংবা জামিনে মুক্ত এসব অপরাধীর মধ্যে অর্ধশতাধিক রয়েছে পুলিশের শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকায়ও। অনেকেই আবার যোগাযোগ শুরু করেছে বিভিন্ন কারাগারে বন্দি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে। জেল থেকে ছাড়িয়ে আনতে বেপরোয়া চাঁদাবাজি শুরু করেছে তাদের সহযোগীরা।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ কারাবন্দি থেকে ফিরে দেশে-বিদেশে পলাতক থেকে অনায়াসেই নিয়ন্ত্রণ করছে এই আন্ডারওয়ার্ল্ড। এলাকার আধিপত্য বিস্তার এবং দলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগীদের হাতে বিস্ময়করভাবে পৌঁছে যাচ্ছে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, চাঁদাবাজি এবং এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতা থেকে উত্থান হয়েছিল শীর্ষ সন্ত্রাসীদের। কিন্তু এখন হিরোইজম থেকে কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে সন্ত্রাসী খাতায় নাম লেখাচ্ছে অপরাধীরা। আর অন্তরলে থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী কিংবা গডফাদাররাই এদের শেল্টারদাতা। তাদের ওপর আশীর্বাদ রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের। আবার জামিন পাওয়া একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়ে নিহত হলে অপর আলোচিত সন্ত্রাসীরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও নতুন মাঠে নামা সন্ত্রাসীদের কাছে টেনে নিচ্ছে। যে কারণে এখনকার সন্ত্রাসীরা বেশি বেপরোয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তালিকাভুক্তসহ অনেক সন্ত্রাসী জেল ছাড়া পেয়েছে। আবার অনেক সন্ত্রাসী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে। তাদের সহযোগীরাও এতে উৎসাহ পেয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে খুন, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে চলছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসীদের হালনাগাদ তালিকা না থাকায় রাজধানীতে সন্ত্রাসীদের প্রকৃত সংখ্যা জানা নেই কারো। রাজধানী ঢাকায় ২০টি কিলার গ্রুপ তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র।
পুলিশ সদর দফতরের মুখপাত্র ও এআইজি এ এইচ এম শাহাদত হোসেন জানান, তাদের কাছে নতুন সন্ত্রাসীদের কোনো হালনাগাদ তালিকা নেই। সদর দফতর এটা করেও না। তবে ডিএমপিসহ অন্য জেলা, র্যাব, ডিবি সন্ত্রাসীদের তালিকা করে। প্রতিনিয়ত তারা তালিকা নিয়ে অপরাধীদের গ্রেফতার করছে। গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে গতকাল পর্যন্ত মোট ৩৫ হাজার ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে সন্ত্রাসীদের সংখ্যাই বেশি। তবে গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে পুলিশের তৈরীকৃত একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের তথ্যানুয়ায়ী রাজধানীতে সক্রিয় রয়েছে প্রায় এক হাজার ২০০ চাঁদাবাজ। আর চাঁদাবাজিকে ঘিরেই সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলছে। পুলিশ চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে ৩২৯ জনকে চিহ্নিত করেছে। তাদের মধ্যে ২৭১ জনের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। গোয়েন্দা রিপোর্টে মিরপুর, কাফরুল, পল্লবী, শাহআলী, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, খিলগাঁও, সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, কোতোয়ালি, লালবাগ, ডেমরা থানা এলাকা সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ। মোহাম্মদপুর সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল ছাড়াও মাদকের বড় হাট বলে পরিচিত। সন্ত্রাসীরা বিদেশি নম্বরে হোয়াটঅ্যাপ ব্যবহার আবার কখনো কখনো সরাসরি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদা দাবি এবং হুমকি দিচ্ছে।
খিলগাঁও, রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় ভয়ংকর সন্ত্রাসী সুজন কাইলা নবীর ক্যাডার বহিনীর কাছে জিম্মি কয়েক হাজার মানুষ। চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, জমিদখল থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধের নিয়ন্ত্রণ করছে থানার তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসীরা। সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগ উঠেছে, তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের প্রতিবাদ করায় খিলগাঁও থানার তিন যুবদল নেতা ফেরারি আসামির মতো জীবনযাপন করছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার পরোক্ষ মদদে তারা অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। তাদের রয়েছে কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসী বাহিনী। সংশ্লিষ্ট এলাকায় তারা মাদক কারবারের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, নারীদের ইভটিজিং, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মূলেও তারা। সন্ত্রাসী সূজনের গোরান নূরবাগ পানি পাম্প এলাকার বাশার মার্ডার মামলার আসামি। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী শরিফ ইয়াবার ডিলার। শিপলু ও টিপু সন্ত্রাসী কর্মকা-ের আড়ালে ইয়াবার ব্যবসা করছে। ৫ আগস্টের আগে সুজনের মূল ব্যাকআপ ছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা নবী। বর্তমানেও সে কয়েকজন মাঠপর্যায়ের সরকারি দলের কয়েকজন নেতাকে ম্যানেজ করে তার অপরাধ কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে গোরান এবং খিলগাঁও এলাকায়। দক্ষিণ বনশ্রীতে তাদের অফিসও রয়েছে। সেখানকার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা জমিদখলের টাকার ভাগ-বাটোয়ারা করছে। কাইল্যা নবী বর্তমানে বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছেন। গত এপ্রিলে শ্যামলীতে এক চিকিৎসকের কাছে চাঁদাদাবির অভিযোগে যুবদলের সাবেক এক নেতা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মোহাম্মদপুর-আদাবর জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর পলাতক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলররা এলাকার পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে সন্ত্রাসীদের অর্থ দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং সরাসরি খুন ও সন্ত্রাসী হামলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে কিলার বাদল, কাইল্যা সুমন, কিলার জসীমসহ ৩০ জনের সন্ত্রাসী বাহিনী। যে বাহিনীর হাতে রয়েছে অন্তত কয়েক শত অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। ভারতে পলাতক নবীকে সম্প্রতি আদাবর এলাকায় দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রমতে, এক সময়ের থানা ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাতের নামে চলছে এখনো ঢাকার মিরপুর এলাকা। মিরপুর ৬, ৭, ১১ নম্বর ও পল্লবী এলাকায় শাহাদাতের হয়ে কাজ করছে শতাধিক সন্ত্রাসী। বিভিন্ন মিশনে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করে গালকাটা বাবু, রইস সুমন, বাপ্পি ও রুবেল। শাহাদাত বাহিনীর এই সদস্যদের সবার বিরুদ্ধে থানায় হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। অপরদিকে পল্লবীর সেকশন ৭ ও ১১ নম্বর এলাকায় চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের মধ্যে রয়েছে ফারুক আহমেদ হেলাল, লিটন, আসাদ ও জহির। অভিযোগ রয়েছে: সেখানে চুক্তিতে অপরাধ করা সন্ত্রাসীদের তালিকায় রয়েছে: দুলু, নান্নু, টুটুল, চুন্ন, বুক্কো সুমন। মিরপুর-১২ নম্বর এলাকায় চাঁদাবাজিতে সক্রিয় আশিক, আমান গ্রুপ। মিরপুর-১ নম্বর, গুদারাঘাট এলাকায় সন্ত্রাসী আতঙ্কের নাম শাহীন, বল্টু রাসেল, টিটু। সক্রিয় রয়েছে এখনো পিয়াল গ্রুপও। ফার্মগেট, রাজাবাজার গ্রিন রোড, পান্থপথ এখনো চলে জেল ছাড়া পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের নামে। তার বাহিনীতে রয়েছে: টুটুল, নজরুল, চাঁদপুইর্যা বাবু. গান্ডু শাহীন, লিটু, শাহ আলম, বাদশাহ, মকবুল, জসীম, আলম, টোকাই মাসুম। পশ্চিম রাজাবাজার এলাকায় স্বপন, পান্থপথ এলাকায় তরকারি রফিক ও ফারুক। পুরান ঢাকার শহীদ কমিশনার পট-পরিবর্তনের পর থেকে পলাতক রয়েছে। তবে তার ক্যাডার বাহিনী এখনো সক্রিয়। ডিআইটি প্লটের জাহাঙ্গীর, হাফিজুর, রবু, কালা, বশির, সোহেল, ছাপু, টিটু, ইমরান, মিজান, রিংকু ইয়ার মোহাম্মদ, শ্যালক আরিফ, রাজু, জুয়েল, আলম টিটো ও মুরগি বাবু তার বাহিনীর সদস্য।
বাড়ছে ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার : সম্প্রতি খুনের ঘটনায় কিলাররা ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে বেশি। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা প্রতিনিয়ত যত অস্ত্র উদ্ধার করছে তার অধিকাংশই স্মল আর্মস। জানা যায়, পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে আড়াই-তিন লাখ টাকা মূল্যের স্মল আর্মস রয়েছে সন্ত্রাসীদের হাতে। পাঁচ হ্জাার টাকায় বিক্রি হচ্ছে পাইপগান। হাজার-বারো হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে ওয়ান শুটারগান। ওয়ান টাইম হাউস করার মতো রিভলবার ও পিস্তল পাওয়া যাচ্ছে কম মূল্যে। আর মোটামুটি নির্ভরযোগ্য ছোট অস্ত্রের দাম ২০-২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে আড়াই-তিন লাখ টাকা। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত এক বছরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে এমন কিছু অস্ত্র দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে যান খোদ উদ্ধারকারিরাই। এক সন্ত্রাসীর কাছে সর্বাধুনিক ও সবচেয়ে ছোট স্মিথ ওয়েলসন রিভলবার পেয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কারণ ওই অস্ত্র ব্যবহারকারীদের তালিকায় রয়েছে আমেরিকার অত্যাধুনিক গোয়েন্দারা।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রচলিত নাম ও তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, জার্মানির ওয়ালআর পিপিকে, ইতালির পেট্টো বেরেটা, আমেরিকার তাউরাস, আর্মেনিয়ার সিজি ৮৩ ও স্মিথ ওয়েলসন ব্র্যান্ডের অসংখ্য রিভলবার ও পিস্তল রয়েছে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সন্ত্রাসীদের হাতে। এসব অস্ত্রের মডেল পয়েন্ট টুটু বোর থেকে শুরু করে নাইন এমএম। অরিজিনাল রিভলবার বা পিস্তলের মূল্য এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকা। অন্যদিকে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মিয়ানমার থেকেও অসংখ্য রিভলবার ও পিস্তল আসছে দেশের অপরাধ জগতে। এসব আগ্নেয়াস্ত্রের মূল্য ২০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা। আন্ডারগ্রাউন্ডের পেশাদার কিলার বা সন্ত্রাসীরা নিজেদের সংগ্রহে দুই ধরনের অস্ত্র মজুদ করে রাখে। খুনের মিশন বা হামলায় দু-তিনটি কম দামের অস্ত্রের সঙ্গে একটি ব্র্যান্ডের অস্ত্র পাঠানো হয়। লক্ষ্যবস্তুতে নিশ্চিত হামলার কাজে ব্যবহার করা হয় ওই অস্ত্রটি, আর মহড়া বা ফাঁকা গুলি ফুটাতে ব্যবহার হয় কম দামি অস্ত্র। বিপদে পড়লে এসব কম দামি অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যাওয়া যায়। এক্ষেত্রে নির্দেশদাতার নির্ভরশীল সদস্যরাই হাতে পায় ব্রান্ডেড আর্মস।









